ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়া কর্মসূচি ১১ বছর পূর্ণ করেছে। ২০১৫ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল সরকারি সেবা, ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-গভর্ন্যান্স এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবাকে এক কাঠামোর মধ্যে আনা। ২০২৬ সালে এসে ভারত সরকার বলছে, এই কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে: ডিজিটাল রাষ্ট্র কি শুধু অ্যাপ বানিয়ে হয়, নাকি এর জন্য প্রয়োজন পরিচয়, পেমেন্ট, ডেটা, সংযোগ এবং সেবার সমন্বিত কাঠামো?
ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি স্তম্ভ। ব্রডব্যান্ড হাইওয়ে, মোবাইল সংযোগ, কমন সার্ভিস সেন্টার, ই-গভর্ন্যান্স, ই-ক্রান্তি, ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহ, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, আইটি কর্মসংস্থান এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি। এসব স্তম্ভ আলাদা প্রকল্প হলেও লক্ষ্য ছিল একটাই: নাগরিক যেন কাগজের ফাইল, দীর্ঘ লাইন এবং দালালি নির্ভর প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ডিজিটালভাবে সেবা পেতে পারেন।
ভারতের বড় অর্জন

ভারত এখন ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইয়ের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্টে বৈশ্বিক আলোচনায় রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্ট লেনদেনের প্রায় অর্ধেক ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হয়। ডিজিটাল অর্থনীতি ভারতের জিডিপির ১২ থেকে ১৪ শতাংশ অবদান রাখছে বলে দাবি করা হচ্ছে এবং আগামী দশকে তা আরও বড় অংশ নিতে পারে। গ্রামীণ সংযোগেও অগ্রগতি হয়েছে। ভারতনেটের আওতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েত সংযুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশেও ডিজিটাল সেবা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন কর, ই-পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন, ভূমি সেবা এবং সরকারি পোর্টাল রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেবাগুলো বিচ্ছিন্ন, ব্যবহারবান্ধব নয় বা একই তথ্য বারবার দিতে হয়। ভারতের মডেলের মূল শিক্ষা হলো, ডিজিটাল সেবা সফল করতে হলে নাগরিক পরিচয়, পেমেন্ট, ডকুমেন্ট, অভিযোগ, ভেরিফিকেশন এবং ডেটা বিনিময়কে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।
তবে ভারতীয় মডেল অন্ধভাবে অনুসরণ করার বিষয় নয়। বড় ডেটাবেসের সঙ্গে গোপনীয়তা, নজরদারি, সাইবার ঝুঁকি এবং ডিজিটাল বিভাজনের প্রশ্নও আসে। প্রযুক্তি যদি সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের বদলে কেবল নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হয়, তাহলে ডিজিটাল রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
![]()
পরবর্তী প্রশ্ন
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন নাগরিককেন্দ্রিক ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা যেখানে একজন মানুষ জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, কর, জমি ও সামাজিক সুরক্ষা সেবা একাধিক দপ্তরে ঘুরে নয়, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পেতে পারেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ১১ বছর তাই শুধু ভারতের সাফল্যের গল্প নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্র, প্রযুক্তি ও নাগরিক সেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক পাঠ।
এখানে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বাস্তব শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা। ডিজিটাল প্রকল্প এক সরকারের প্রচার স্লোগান হয়ে থাকলে নাগরিক সেবা টেকসই হয় না। বাজেট, আইন, ডেটা মান, সাইবার নিরাপত্তা, স্থানীয় ভাষার ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ একসঙ্গে এগোতে হয়। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, বড় ডিজিটাল ব্যবস্থার ফল পেতে সময় লাগে, কিন্তু ধারাবাহিক নীতি থাকলে তা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অংশ হয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















