এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও এবার স্বাস্থ্য প্রতারণাকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেখা গেছে, বিল গেটস, অ্যান্ডারসন কুপার ও ব্রুস উইলিসের মতো পরিচিত ব্যক্তিত্বদের মুখ ও কণ্ঠ নকল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পণ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়া সারিয়ে দিতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। পণ্যটি মধুভিত্তিক সাপ্লিমেন্ট হিসেবে দেখানো হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কোনো দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এটি দুর্বল ও উদ্বিগ্ন পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে করা প্রতারণা।
এই ধরনের প্রতারণা কেন বিপজ্জনক? কারণ এখানে শুধু টাকা হারানোর ঝুঁকি নেই, আছে চিকিৎসা বিলম্বের ঝুঁকি। আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ নিয়ে পরিবারগুলো সাধারণত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। যখন কেউ পরিচিত ব্যক্তিত্বের মুখে “গোপন চিকিৎসা” বা “ডাক্তাররা যা বলতে চান না” ধরনের দাবি শুনে, তখন সেটি অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। ডিপফেক প্রযুক্তি সেই বিশ্বাসকে অস্ত্র বানায়।
প্রতারণার কৌশল

এ ধরনের বিজ্ঞাপন সাধারণত কয়েকটি কৌশল ব্যবহার করে। প্রথমত, পরিচিত মুখ ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, বলা হয় প্রচলিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সত্য লুকাচ্ছে। চতুর্থত, অল্প সময়ের জন্য বিশেষ ছাড় বা সীমিত অফারের কথা বলা হয়। পঞ্চমত, একবার পেমেন্ট তথ্য দিলে ব্যবহারকারীকে সাবস্ক্রিপশনে আটকে ফেলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ভুক্তভোগী পরে অননুমোদিত পুনরাবৃত্ত চার্জ, কাস্টমার সার্ভিসে সাড়া না পাওয়া এবং রিফান্ড না পাওয়ার সমস্যায় পড়েন।
বাংলাদেশে ঝুঁকি আরও বেশি
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুয়া বিজ্ঞাপন নতুন নয়। ডায়াবেটিস, ক্যানসার, যৌন সমস্যা, কিডনি, লিভার, ওজন কমানো এবং চুল পড়া নিয়ে অসংখ্য ভুয়া দাবি অনলাইনে ছড়ায়। এখন ডিপফেক যুক্ত হলে সমস্যা আরও কঠিন হবে। কোনো জনপ্রিয় ডাক্তার, অভিনেতা, ধর্মীয় বক্তা, সংবাদ উপস্থাপক বা বিদেশি ধনকুবেরের মুখ ব্যবহার করে ভুয়া ওষুধ বিক্রি করা গেলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন।
বাংলা ভাষায় ডিপফেক যাচাইয়ের সক্ষমতা এখনো সীমিত। অনেক মানুষ ভিডিও দেখলেই সত্য ধরে নেন। পরিবারে বয়স্ক সদস্যরা ফেসবুক বা ইউটিউব বিজ্ঞাপন থেকে ওষুধ কিনে ফেললে ক্ষতি হতে পারে।
কীভাবে সতর্ক থাকবেন
যেকোনো স্বাস্থ্য পণ্যের ক্ষেত্রে কয়েকটি নিয়ম মানা জরুরি। কোনো ভিডিওতে পরিচিত ব্যক্তি কিছু বলছেন দেখলেই বিশ্বাস করা যাবে না। “চিকিৎসকরা লুকাচ্ছেন”, “এক সপ্তাহে রোগ সারবে”, “শতভাগ গ্যারান্টি”, “গোপন ফর্মুলা” ধরনের ভাষা দেখলে সন্দেহ করতে হবে। ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট কেনার আগে নিবন্ধিত চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পেমেন্টের আগে কোম্পানির ঠিকানা, রেজিস্ট্রেশন, রিভিউ এবং সাবস্ক্রিপশন শর্ত দেখে নিতে হবে।
ডিপফেক স্বাস্থ্য প্রতারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এআই যুগে চোখে দেখা সব সত্য নয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিষয়ে ভুল বিশ্বাস শুধু অর্থ নয়, জীবন ও চিকিৎসাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এমন বিজ্ঞাপন দেখলে শুধু ভাইরাল ভিডিও হিসেবে প্রচার না করে, দাবি যাচাই, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মতামত, ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা এবং পেমেন্ট প্রতারণার ধরন তুলে ধরা দরকার। স্বাস্থ্য প্রতারণা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি না হলে একই কৌশল ভিন্ন রোগ, ভিন্ন মুখ এবং ভিন্ন পণ্যের নামে আবার ফিরে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















