টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির চাপে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার আতাই নদীর একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ায় অন্তত ১০টি গ্রাম বন্যার হুমকিতে রয়েছে। মোমিনপুর ও হাজিগ্রাম গ্রামের মাঝামাঝি অংশে বাঁধে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বাঁধটি ভেঙে গেলে বিস্তীর্ণ জনপদ পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে শত শত বসতবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বাঁধের বর্তমান অবস্থা
ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি কামারগাতি-পাথের বাজার সড়কের অংশ, যা একসময় দৌলতপুর হয়ে খুলনা শহরের সঙ্গে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ছিল।
গত এক দশকে আতাই নদীর অব্যাহত ভাঙনে সড়কটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অবশিষ্ট অংশটি বর্তমানে কার্যত বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যোগাযোগের জন্য এলাকাবাসী এখন বিকল্প সড়কের ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের উচ্চ পানির কারণে বাঁধটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পানি বাঁধ উপচে পড়তে শুরু করলে বিভিন্ন স্থানে বড় ফাটল সৃষ্টি হয়, যা ভাঙনের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়।
গ্রামবাসীর জরুরি উদ্যোগ
পরিস্থিতির অবনতি দেখে শুক্রবার সন্ধ্যায় জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে বাঁশ ও মাটি দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধটি মেরামতের চেষ্টা করেন। ফ্লাডলাইটের আলোয় রাত পর্যন্ত চলে এই কাজ।
তবে তাদের দাবি, এই উদ্যোগে আপাতত ঝুঁকি কিছুটা কমলেও স্থায়ী সমাধান না হলে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।
বাঁধ ভেঙে গেলে কালিয়া, তেরোখাদা, গাজীরহাট, কোলা, আরুয়া, আম্বারিয়া, কামারগাতি, লাখয়াতি, মাধবপুর, রাধামাধবপুর, নন্দন প্রতাপ, বরাকপুর ও মোমিনপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, এটি মূলত একটি সড়ক ছিল, যা ২০১৩ সাল থেকে নদীভাঙনের কারণে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে হতে এখন বন্যা প্রতিরোধ বাঁধে পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, চলতি বছরে এটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবছর নদীভাঙন রোধে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাশের এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মানুষ।
আরেক বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, গ্রামবাসী আপাতত বাঁশ ও মাটি দিয়ে পানি ঠেকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এভাবে বেশিদিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি দ্রুত সরকারের উদ্যোগে টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
প্রশাসনের বক্তব্য
দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন দাস গুপ্ত জানান, বাঁধ মেরামতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
তিনি বলেন, সড়কের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাউবোর প্রকৌশলীদের মতে, আশপাশের মাছের ঘের এখনও পানিতে ডুবে থাকায় কেবল অস্থায়ী মেরামত দিয়ে পানির চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
ইউএনও আরও জানান, বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য, পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। তিনি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
খুলনার দিঘলিয়ায় আতাই নদীর দুর্বল বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় অন্তত ১০টি গ্রাম বন্যা ঝুঁকিতে। স্থানীয়দের জরুরি মেরামতের পরও স্থায়ী সমাধানের দাবি জোরালো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















