ইউক্রেনের জনপ্রিয় ও সংস্কারপন্থী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তার বিদায় ঘিরে ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। পুরোনো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে গিয়ে ফেদোরভ সামরিক নেতৃত্বের একাংশের বিরোধিতার মুখে পড়েন।
সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাত্রা
৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভ এর আগে ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি সেবা সহজ করতে তিনি মোবাইলভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ চালু করে পরিচিতি পান। রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেনের ড্রোন সক্ষমতা বাড়াতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তার সমর্থকদের ধারণা ছিল, যেভাবে তিনি সরকারি ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এনেছিলেন, একইভাবে সেনাবাহিনীকেও আধুনিক করতে পারবেন। তবে সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করতেন, যুদ্ধ পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া বড় ধরনের সামরিক সংস্কার চালানো কঠিন।
সংঘাত বাড়ে সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে
দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেদোরভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য সামনে আনেন। পাশাপাশি অস্ত্র কেনাকাটায় খরচ কমাতে নতুন পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করেন।
তবে এসব পদক্ষেপে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। বিশেষ করে সেনাপ্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কির সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
সামরিক বৈঠকগুলোতে দুই পক্ষের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেনা কর্মকর্তারা ড্রোন অভিযানের অগ্রগতির কথা তুলে ধরলেও অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ নিয়ে ফেদোরভের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
মানবসম্পদ সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা
ফেদোরভ সেনাবাহিনীর জনবল সংকট সমাধানে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। সামনের সারির সেনাদের বেতন বাড়ানো, নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব চালু এবং দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারীদের সীমিতভাবে অবসরের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব ছিল তার পরিকল্পনায়।
এ ছাড়া বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগ বাড়ানো এবং অনুপস্থিত থাকা বিপুলসংখ্যক সেনাকে শাস্তি ছাড়াই ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

সমালোচনা ও রাজনৈতিক পরিণতি
সেনাবাহিনীর সমালোচকদের মতে, ফেদোরভ প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সংস্কারে দক্ষ হলেও যুদ্ধ পরিচালনার মতো জটিল বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা সীমিত ছিল। তাদের দাবি, তার কিছু উদ্যোগ আগেই চলমান ছিল, যা তিনি নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
জেলেনস্কি তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। তবে ফেদোরভ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। পরে অন্য একজন ব্যবস্থাপকের নাম প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য সামনে আসে।
বিদায়ের আগে ফেদোরভ জানিয়েছিলেন, তিনি নিজের নীতিতে অটল থাকতে চেয়েছেন এবং কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে চাননি। তার অপসারণ ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই ঘটনা দেশটির সামরিক সংস্কার, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















