বিশ্বের অর্থ লেনদেন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলতে জোর দিচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় প্রভাব ধরে রাখা মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভিসা ও মাস্টারকার্ডের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
নিজস্ব পেমেন্ট ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো
ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন নতুন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা মার্কিন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলছে। তবে ব্রাজিল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের তৈরি এই ব্যবস্থা থেকে তারা সরে আসবে না।
শুধু ব্রাজিল নয়, ইউরোপ, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ এখন নিজস্ব বা আঞ্চলিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্রিয়। এর লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনে বিদেশি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানো।
ইউরোপে বিকল্প ব্যবস্থার গতি
ইউরোপে ইতোমধ্যে একক ইউরো পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নতুন ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দ্রুত অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাকে এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করবে।
এদিকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ভবিষ্যতে ডিজিটাল ইউরো চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা এখন সময়ের দাবি।
চীন ও ভারতের বিস্তার
চীন সীমান্তপারের অর্থ লেনদেনের জন্য নিজস্ব অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। দেশটির বিকল্প আন্তঃব্যাংক পেমেন্ট নেটওয়ার্কে লেনদেনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থাও আরও বেশি দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের কিউআর কোডভিত্তিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে একাধিক দেশে চালু হয়েছে। আরও কয়েকটি দেশ এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ভারতের লক্ষ্য শুধু নিজস্ব নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ নয়, অন্যান্য দেশকেও তাদের নিজস্ব পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
ভিসা ও মাস্টারকার্ডের সামনে চাপ
জাতীয় ও আঞ্চলিক পেমেন্ট ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় ভিসা ও মাস্টারকার্ডের ব্যবসায়িক অবস্থান চাপে পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপের মতো বড় বাজারে দেশীয় বিকল্প ব্যবস্থার বিস্তার তাদের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে দুই প্রতিষ্ঠানই বিভিন্ন অঞ্চলে প্রযুক্তি অবকাঠামোতে নতুন বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ইউরোপে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।
বাড়ছে বৈশ্বিক ঝুঁকিও
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন দেশ যদি আলাদা আলাদা পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এতে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে অনেক দেশের কাছে আর্থিক সার্বভৌমত্ব এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত বিষয়েও পরিণত হয়েছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
বিশ্বের অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন, নিজস্ব নেটওয়ার্কে ঝুঁকছে দেশগুলো
বিশ্বের অর্থ লেনদেন ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসছে। ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এর ফলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন ভারসাম্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে প্রতিযোগিতাও।
বিশ্বজুড়ে নিজস্ব পেমেন্ট নেটওয়ার্ক তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। ইউরোপ, চীন, ভারত ও ব্রাজিলসহ অনেক দেশ আন্তর্জাতিক লেনদেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।
ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তবে জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার অব্যাহত থাকলে তাদের দীর্ঘদিনের বাজার আধিপত্যে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের ধরন বদলে যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সীমান্তপারের লেনদেনে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বজুড়ে নিজস্ব পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আগামী দিনে এর প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য, আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















