দলের নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যা বেশি হলেই কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ অমান্য করতে পারে না বলে স্পষ্ট করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছে, গণতন্ত্রের পরিপক্বতা নির্ভর করে রাজনৈতিক দল ও তাদের সদস্যরা কতটা নিজেদের আদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রতি অটল থাকে তার ওপর।
বুধবার ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি হয়। বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি মন্তব্য করেন, শুধু আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে কোনো দলের বিধায়ক বা সংসদ সদস্যরা মূল রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করতে পারেন না।
শিবসেনা বিভক্তি নিয়ে শুনানি
মহারাষ্ট্রের শিবসেনার দুই গোষ্ঠী—উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা এবং বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্দের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর মধ্যে প্রকৃত দল ও দলীয় প্রতীকের অধিকার নিয়ে চলা বিরোধের শুনানি করছে সুপ্রিম কোর্ট।
২০২২ সালের জুনে শিবসেনায় বড় ধরনের বিভক্তি দেখা দেয়। একনাথ শিন্দে দলের ৫৫ জন বিধায়কের মধ্যে ৪০ জনকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপির দেবেন্দ্র ফড়নবিশের শিবিরে যোগ দেন এবং নতুন সরকার গঠন করেন। পরে ভারতের নির্বাচন কমিশন শিন্দে গোষ্ঠীকেই “প্রকৃত” শিবসেনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অধিকার দেয়।
সংখ্যার জোরে দল দখলের বিরোধিতা
উদ্ধব ঠাকরের পক্ষে থাকা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিবাল আদালতে যুক্তি দেন, কিছু বিধায়ক বা সংসদ সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এটি গণতান্ত্রিক বা আদর্শিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্ষমতা দখলের কৌশল।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে সরকারকে ক্ষমতায় আনে, যদি কিছু নির্বাচিত প্রতিনিধি দলত্যাগ বা কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই সরকার বদলে দেন, তাহলে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিবাল আরও বলেন, রাজনৈতিক দলের ওপর আইনসভা দলের নিয়ন্ত্রণ থাকে না; বরং মূল রাজনৈতিক দলের বৈধ সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাবে। কোনো গোষ্ঠী শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা করলে সেটি দলত্যাগের আওতায় পড়তে পারে।
রাজনৈতিক দল ও আইনসভা দলের পার্থক্য
সুপ্রিম কোর্ট এর আগে এক সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ে বলেছিল, “মূল রাজনৈতিক দল” এবং “আইনসভা দল” দুটি পৃথক বিষয়। দলীয় সিদ্ধান্ত এবং বিধায়কদের ব্যক্তিগত অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আদালত জানিয়েছে, গণতন্ত্রে একদিকে যেমন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, অন্যদিকে ভোটাররা যে রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় এনেছেন সেই দলের আদর্শ ও কাঠামোর প্রতিও সম্মান থাকা প্রয়োজন।
বিচারপতি বাগচি মৌখিক পর্যবেক্ষণে বলেন, কোনো দলের কিছু সদস্য শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দলের পদাধিকারীদের সরিয়ে দিতে পারেন না। এ ধরনের পদক্ষেপ দলীয় সদস্যপদ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করার সমতুল্য হতে পারে।
দলত্যাগ আইন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
শুনানিতে কপিল সিবাল বলেন, ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী দলত্যাগবিরোধী আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দল পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার ফেলে দেওয়ার প্রবণতা রোধ করা।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, কয়েকজন বিধায়ক কীভাবে মূল রাজনৈতিক দলের অনুমোদন ছাড়া অন্য দলের সঙ্গে “একীভূত” হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁর মতে, আইনসভা দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিক দলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হলে যেকোনো সময় নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করা সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্ট এখন এই মামলায় রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















