প্রকৃতির কিছু দৃশ্য মানুষের মনে একই সঙ্গে স্বস্তি ও বিষণ্নতা এনে দেয়। টানা বৃষ্টির শব্দ, মেঘলা আকাশ কিংবা শীতল বাতাস অনেকের কাছে বিশ্রামের অনুভূতি তৈরি করে। ব্যস্ত জীবনের ছন্দ কিছুক্ষণের জন্য ধীর হয়ে আসে। গরম এক কাপ চা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা ঘরের নিরাপদ আশ্রয়—বৃষ্টির দিনকে অনেকে এভাবেই অনুভব করেন।
কিন্তু এই অভিজ্ঞতা সবার নয়। একই বৃষ্টি কারও কাছে আরামের, আবার কারও কাছে অনিশ্চয়তা, ক্ষতি ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। তাই প্রকৃতিকে রোমান্টিকভাবে দেখার আগে আমাদের মনে রাখা দরকার, দুর্যোগের অভিঘাত সমাজের সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না।
একজন অফিসগামী কর্মীকে হয়তো স্বাভাবিকের চেয়ে আরও আগে ঘর থেকে বের হতে হয়, কারণ রাস্তায় জল জমবে, যানজট বাড়বে কিংবা পরিবহন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দিনমজুরের জন্য বৃষ্টি মানে কাজ হারানোর আশঙ্কা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের খাবারের থালায়। শিক্ষার্থীর জন্য এটি স্কুলে পৌঁছানোর লড়াই, আর উপকূলের জেলে বা কৃষকের জন্য এটি জীবিকা হারানোর বাস্তব শঙ্কা।
আরও বড় বাস্তবতা হলো, যাদের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নেই, তাদের কাছে প্রতিটি বর্ষণই এক নতুন সংকট। নিম্নআয়ের পরিবার, নদীভাঙনের শিকার মানুষ কিংবা পথের প্রাণীরা দুর্যোগের সবচেয়ে কঠিন মূল্য পরিশোধ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে।
সহনশীলতার প্রশংসা নয়, প্রস্তুতির রাজনীতি
বছরের পর বছর ধরে নানা দেশের মানুষ দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি শব্দকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে—‘সহনশীলতা’ বা ‘রেজিলিয়েন্স’। নিঃসন্দেহে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তি। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্র তার পরিকল্পনার ঘাটতি আড়াল করতে নাগরিকদের সহনশীলতাকেই সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে তুলে ধরে, তখন সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কোনো সমাজের মানুষের বারবার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতাকে উদযাপন করার চেয়ে তাদের সেই কষ্ট থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের দৃঢ়তা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু সেটি কখনোই কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প হতে পারে না।
চরম আবহাওয়ার যুগে নতুন বাস্তবতা
বিশ্বজুড়ে এখন চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতি শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবন নয়, পুরো অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে নৌপরিবহননির্ভর অঞ্চলগুলোতে খারাপ আবহাওয়া মানেই যাত্রী চলাচল ব্যাহত হওয়া, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং হাজারো মানুষের দুর্ভোগ।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকেই শুধু বাতিল হওয়া যাত্রা বা সাময়িক অসুবিধাটিই দেখতে পান। কিন্তু নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে যে দীর্ঘ প্রস্তুতি, সমন্বয় ও ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়, তা সাধারণ মানুষের চোখে খুব কমই ধরা পড়ে।
একটি দায়িত্বশীল পরিবহন ব্যবস্থায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়, ঝুঁকিপূর্ণ রুটে চলাচল সীমিত করা, যাত্রীদের দ্রুত তথ্য জানানো এবং জরুরি সহায়তা প্রস্তুত রাখা—এসবই নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ। কোনো যাত্রা স্থগিত করা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটি সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়ানোর জন্য নেওয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
একইভাবে দুর্যোগের সময় সরকারি কর্মচারী, উদ্ধারকর্মী, বন্দর ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যান। তাঁদের এই নীরব দায়িত্ববোধ অনেক সময় আলোচনায় আসে না, অথচ সংকট মোকাবিলায় তার গুরুত্ব অপরিসীম।
অবকাঠামোয় বিনিয়োগ মানেই নিরাপত্তায় বিনিয়োগ
তবে শুধু জরুরি সাড়া দিলেই চলবে না। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা, আধুনিক বন্দর, কার্যকর যোগাযোগ, উন্নত আশ্রয়কেন্দ্র এবং জলবায়ু সহনশীল নগর পরিকল্পনায় বিনিয়োগই ভবিষ্যতের বড় দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে পারে।
এ ধরনের বিনিয়োগকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো একই সঙ্গে মানুষের জীবনরক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল।
আজকের পৃথিবীতে প্রশ্নটি আর মানুষ কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারে, সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত, কতটা দায়িত্বশীল এবং কত দ্রুত নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
বৃষ্টির দিনে যারা ঘরের ভেতর নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে, তাদেরও মনে রাখা উচিত যে একই সময়ে অসংখ্য মানুষ রাস্তায়, নদীতে, খোলা আকাশের নিচে কিংবা কর্মস্থলে জীবন ও জীবিকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য এই বৈপরীত্যকে স্বীকার করাই প্রথম শর্ত।
প্রতিটি বর্ষা তাই আমাদের নতুন করে একটি শিক্ষা দেয়—দুর্যোগকে কেবল সহ্য করার গল্পে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একটি মানবিক ও দূরদর্শী সমাজের পরিচয় হবে এমন প্রস্তুতিতে, যেখানে মানুষকে বারবার নিজেদের সহনশীলতার পরীক্ষা দিতে না হয়। নিরাপত্তা, পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল শাসনই হওয়া উচিত প্রতিটি বর্ষাকালের সবচেয়ে বড় আশ্বাস।
(লেখক: ইউনিস সামন্তে। মূল নিবন্ধের ভাব, যুক্তি ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাংলা ভাষায় পুনর্লিখিত।)
ইউনিস সামন্তে 


















