১২:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পর্তুগালের ‘হ্যাম্পটনস’ কমপোর্তা: সমুদ্র, বন আর বিলাসিতার এক গোপন স্বর্গ শরতের আগমনী বার্তা সেলেনা গোমেজ ও বেনি ব্লাঙ্কোর ভেনিস ভ্রমণে ইউএস ওপেন শুরুর আগেই নিউইয়র্কে তারকাদের ঝলমলে পার্টির আসর শৈশবের বার্বি থেকে ভবিষ্যতের মানবাকৃতি—ইউন আহনের কল্পনায় বদলে গেল চেনা পুতুলের জগৎ কাজের চাপ নয়, ভারসাম্যই সাফল্যের চাবিকাঠি: বার্নআউট এড়াতে ড্যানিয়েল লুবেটজকির ৪ পরামর্শ অপরিচিত এক বৃদ্ধের জীবনের শেষ তিন সপ্তাহের গল্প ধরে রাখলাম স্মৃতির পাতায় ঘর গোছাতে গিয়ে যে ৬ ভুলে আরও বাড়ে অগোছালোভাব ছবিতে দারুণ, বাস্তবে বেমানান—অন্দরসজ্জার যে ১০ প্রবণতা এড়িয়ে চলার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের হার্ভার্ডকে পেছনে ফেলে শীর্ষে চীনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়, যোগ দিলেন মার্কিন চিপ বিশেষজ্ঞ দুই দেশের গোয়েন্দাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি, চীনে প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী গ্রেপ্তার

দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদায় চীনের অর্থনীতি, ইউয়ানের উত্থানে লাগাম টানছে বেইজিং

চীনের মুদ্রা ইউয়ানের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক উত্থানে এবার লাগাম টানার চেষ্টা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনীতির ভারসাম্য ধরে রাখতে ইউয়ানের আরও দ্রুত শক্তিশালী হওয়া ঠেকাতে চাইছে বেইজিং।

গত প্রায় ২০ মাসে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মূল্য প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এটি সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছরের বাকি সময়ে ইউয়ানের এই উত্থানের গতি অনেকটাই কমে আসতে পারে।

বছরের শেষে ইউয়ান কোথায় দাঁড়াবে

বিশ্বের একাধিক বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের ১২ জন বিশ্লেষকের পূর্বাভাসের মধ্যম মান অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের বিনিময় হার হতে পারে প্রায় ৬ দশমিক ৬৮। সোমবারের হার ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৭২।

অর্থাৎ বছরের শেষ নাগাদ ইউয়ান কিছুটা শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু বড় ধরনের উত্থানের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণপ্রবাহ ও ভোক্তা ব্যয়—অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূচক—নিচের দিকে যাচ্ছে। ফলে এমন সময়ে ইউয়ানের ব্যাপক শক্তিশালী হওয়া চীনের অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রপ্তানি এখনো অর্থনীতির বড় ভরসা

চীনের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি হচ্ছে রপ্তানি। এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশটির মুদ্রার মূল্য বাড়াতে সহায়তা করেছে। রপ্তানিকারকেরা বিদেশি মুদ্রা দেশে এনে ইউয়ানে রূপান্তর করায় ইউয়ানের ওপর স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি একই গতিতে এগোচ্ছে না। ভোক্তা ব্যয় দুর্বল, ব্যবসায়িক আস্থা কম এবং সুদের হারও অত্যন্ত নিচু পর্যায়ে রয়েছে। এসব কারণে অর্থনীতির ভেতরের চাহিদা বাড়ছে না, বরং বিদেশে মূলধন চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

চীনা মুদ্রার মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাবেও ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইউয়ান প্রকৃত মূল্যের তুলনায় সর্বোচ্চ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত অবমূল্যায়িত হতে পারে। তবে চীন ওই পদ্ধতি ও হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

‘ভারসাম্যপূর্ণ’ ইউয়ান চায় বেইজিং

চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইউয়ানের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে একটি সূক্ষ্ম নীতি অনুসরণ করে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিদিন একটি মধ্যবর্তী বিনিময় হার নির্ধারণ করে এবং বাজারের গতিপথকে প্রভাবিত করতে নীতিগত সংকেতও দেয়।

গত বছরের নভেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত মধ্যবর্তী হার বাজারের প্রত্যাশার তুলনায় তুলনামূলক দুর্বল রাখা হচ্ছে। চলতি মাসে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। এমনকি মার্কিন ডলার দুর্বল হওয়ার কারণে ইউয়ানের শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও নির্ধারিত হার প্রায় স্থির রাখা হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে—চীনা কর্তৃপক্ষ ইউয়ানকে আরও শক্তিশালী হতে না দিয়ে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায়ে রাখতে চাইছে।

চীনের বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোও অভ্যন্তরীণ বাজারে বারবার ডলার কিনেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এতে ইউয়ানের দ্রুত উত্থান ঠেকানোর সরকারি প্রচেষ্টার ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

ইউয়ান স্থিতিশীল থাকলে রপ্তানিকারকেরা সুবিধা পান

ইউয়ানের অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠা চীনের রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক নয়। কারণ বিদেশ থেকে পাওয়া আয় ইউয়ানে রূপান্তর করার সময় মুদ্রার মূল্য বেশি থাকলে একই পরিমাণ বৈদেশিক আয় থেকে তুলনামূলক কম ইউয়ান পাওয়া যায়।

China's economy and financial markets: Reforms and risks | Brookings

অন্যদিকে ইউয়ান অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল থাকলে রপ্তানিকারকেরা তাদের বৈদেশিক আয়ের মূল্য ধরে রাখতে পারেন। ফলে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার সময়ে রপ্তানি খাতকে সচল রাখতে মুদ্রার স্থিতিশীলতা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং মার্চে বলেছিলেন, বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়ার জন্য মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রয়োজন বা উদ্দেশ্য কোনোটিই চীনের নেই। একই সঙ্গে তিনি ইউয়ানের মূল্য নির্ধারণে বাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছিলেন।

আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে

ইউয়ানকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাখার নীতি নিয়ে চীনের বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের কিছু দেশ মনে করে, চীনা মুদ্রার প্রকৃত মূল্য আরও বেশি হওয়া উচিত।

জার্মানির শিল্প খাত চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতা নিয়ে চাপ তৈরি করায় দেশটির নেতৃত্বও চীনের মুদ্রানীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে ইউয়ানের বিনিময় হার শুধু চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে।

দীর্ঘ মেয়াদে ইউয়ান আরও শক্তিশালী হতে পারে

স্বল্প মেয়াদে ইউয়ানের বড় উত্থানের সম্ভাবনা সীমিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে মুদ্রাটি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১২ মাসে এক ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের হার প্রায় ৬ দশমিক ৪-এ নামতে পারে। তবে এর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চীনের অত্যন্ত কম সুদের হার, দুর্বল অভ্যন্তরীণ আস্থা এবং মন্থর ভোক্তা ব্যয়।

Goldman Sachs says yuan 20% undervalued, lifts forecasts to 6.50 in a year  — TradingView News

বিদেশে বিনিয়োগের ওপর সাম্প্রতিক কঠোরতাও দেখাচ্ছে যে চীন বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও মূলধন বহির্গমন নিয়ে সতর্ক।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সাধারণত ইউয়ানকে শক্তিশালী করার পক্ষে কাজ করার কথা। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা সেই প্রবণতাকে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না।

ডলারের গতিপথও গুরুত্বপূর্ণ

ইউয়ানের ভবিষ্যৎ শুধু চীনের নীতির ওপর নির্ভর করছে না; মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার ও সরকারি বন্ডের মুনাফা বাড়লে ডলার আবার শক্তিশালী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউয়ানের উত্থান সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনা মুদ্রা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ডলার দুর্বল হলে ইউয়ান শক্তিশালী হবে, আর ডলার শক্তিশালী হলে ইউয়ানের ওপর চাপ তৈরি হবে। ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের সামগ্রিক গতিপথও ইউয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, চীন আপাতত দ্রুত শক্তিশালী ইউয়ানের পরিবর্তে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রা চায়। রপ্তানি শক্তিশালী থাকলে সামান্য মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হতে পারে, কিন্তু দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ইউয়ানের বড় ধরনের উত্থান অনুমোদনের সম্ভাবনা কম।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পর্তুগালের ‘হ্যাম্পটনস’ কমপোর্তা: সমুদ্র, বন আর বিলাসিতার এক গোপন স্বর্গ

দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদায় চীনের অর্থনীতি, ইউয়ানের উত্থানে লাগাম টানছে বেইজিং

১১:২৩:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনের মুদ্রা ইউয়ানের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক উত্থানে এবার লাগাম টানার চেষ্টা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনীতির ভারসাম্য ধরে রাখতে ইউয়ানের আরও দ্রুত শক্তিশালী হওয়া ঠেকাতে চাইছে বেইজিং।

গত প্রায় ২০ মাসে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মূল্য প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এটি সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছরের বাকি সময়ে ইউয়ানের এই উত্থানের গতি অনেকটাই কমে আসতে পারে।

বছরের শেষে ইউয়ান কোথায় দাঁড়াবে

বিশ্বের একাধিক বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের ১২ জন বিশ্লেষকের পূর্বাভাসের মধ্যম মান অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের বিনিময় হার হতে পারে প্রায় ৬ দশমিক ৬৮। সোমবারের হার ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৭২।

অর্থাৎ বছরের শেষ নাগাদ ইউয়ান কিছুটা শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু বড় ধরনের উত্থানের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণপ্রবাহ ও ভোক্তা ব্যয়—অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূচক—নিচের দিকে যাচ্ছে। ফলে এমন সময়ে ইউয়ানের ব্যাপক শক্তিশালী হওয়া চীনের অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রপ্তানি এখনো অর্থনীতির বড় ভরসা

চীনের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি হচ্ছে রপ্তানি। এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশটির মুদ্রার মূল্য বাড়াতে সহায়তা করেছে। রপ্তানিকারকেরা বিদেশি মুদ্রা দেশে এনে ইউয়ানে রূপান্তর করায় ইউয়ানের ওপর স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি একই গতিতে এগোচ্ছে না। ভোক্তা ব্যয় দুর্বল, ব্যবসায়িক আস্থা কম এবং সুদের হারও অত্যন্ত নিচু পর্যায়ে রয়েছে। এসব কারণে অর্থনীতির ভেতরের চাহিদা বাড়ছে না, বরং বিদেশে মূলধন চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

চীনা মুদ্রার মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাবেও ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইউয়ান প্রকৃত মূল্যের তুলনায় সর্বোচ্চ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত অবমূল্যায়িত হতে পারে। তবে চীন ওই পদ্ধতি ও হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

‘ভারসাম্যপূর্ণ’ ইউয়ান চায় বেইজিং

চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইউয়ানের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে একটি সূক্ষ্ম নীতি অনুসরণ করে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিদিন একটি মধ্যবর্তী বিনিময় হার নির্ধারণ করে এবং বাজারের গতিপথকে প্রভাবিত করতে নীতিগত সংকেতও দেয়।

গত বছরের নভেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত মধ্যবর্তী হার বাজারের প্রত্যাশার তুলনায় তুলনামূলক দুর্বল রাখা হচ্ছে। চলতি মাসে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। এমনকি মার্কিন ডলার দুর্বল হওয়ার কারণে ইউয়ানের শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও নির্ধারিত হার প্রায় স্থির রাখা হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে—চীনা কর্তৃপক্ষ ইউয়ানকে আরও শক্তিশালী হতে না দিয়ে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায়ে রাখতে চাইছে।

চীনের বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোও অভ্যন্তরীণ বাজারে বারবার ডলার কিনেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এতে ইউয়ানের দ্রুত উত্থান ঠেকানোর সরকারি প্রচেষ্টার ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

ইউয়ান স্থিতিশীল থাকলে রপ্তানিকারকেরা সুবিধা পান

ইউয়ানের অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠা চীনের রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক নয়। কারণ বিদেশ থেকে পাওয়া আয় ইউয়ানে রূপান্তর করার সময় মুদ্রার মূল্য বেশি থাকলে একই পরিমাণ বৈদেশিক আয় থেকে তুলনামূলক কম ইউয়ান পাওয়া যায়।

China's economy and financial markets: Reforms and risks | Brookings

অন্যদিকে ইউয়ান অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল থাকলে রপ্তানিকারকেরা তাদের বৈদেশিক আয়ের মূল্য ধরে রাখতে পারেন। ফলে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার সময়ে রপ্তানি খাতকে সচল রাখতে মুদ্রার স্থিতিশীলতা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং মার্চে বলেছিলেন, বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়ার জন্য মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রয়োজন বা উদ্দেশ্য কোনোটিই চীনের নেই। একই সঙ্গে তিনি ইউয়ানের মূল্য নির্ধারণে বাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছিলেন।

আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে

ইউয়ানকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাখার নীতি নিয়ে চীনের বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের কিছু দেশ মনে করে, চীনা মুদ্রার প্রকৃত মূল্য আরও বেশি হওয়া উচিত।

জার্মানির শিল্প খাত চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতা নিয়ে চাপ তৈরি করায় দেশটির নেতৃত্বও চীনের মুদ্রানীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে ইউয়ানের বিনিময় হার শুধু চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে।

দীর্ঘ মেয়াদে ইউয়ান আরও শক্তিশালী হতে পারে

স্বল্প মেয়াদে ইউয়ানের বড় উত্থানের সম্ভাবনা সীমিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে মুদ্রাটি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১২ মাসে এক ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের হার প্রায় ৬ দশমিক ৪-এ নামতে পারে। তবে এর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চীনের অত্যন্ত কম সুদের হার, দুর্বল অভ্যন্তরীণ আস্থা এবং মন্থর ভোক্তা ব্যয়।

Goldman Sachs says yuan 20% undervalued, lifts forecasts to 6.50 in a year  — TradingView News

বিদেশে বিনিয়োগের ওপর সাম্প্রতিক কঠোরতাও দেখাচ্ছে যে চীন বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও মূলধন বহির্গমন নিয়ে সতর্ক।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সাধারণত ইউয়ানকে শক্তিশালী করার পক্ষে কাজ করার কথা। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা সেই প্রবণতাকে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না।

ডলারের গতিপথও গুরুত্বপূর্ণ

ইউয়ানের ভবিষ্যৎ শুধু চীনের নীতির ওপর নির্ভর করছে না; মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার ও সরকারি বন্ডের মুনাফা বাড়লে ডলার আবার শক্তিশালী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউয়ানের উত্থান সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনা মুদ্রা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ডলার দুর্বল হলে ইউয়ান শক্তিশালী হবে, আর ডলার শক্তিশালী হলে ইউয়ানের ওপর চাপ তৈরি হবে। ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের সামগ্রিক গতিপথও ইউয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, চীন আপাতত দ্রুত শক্তিশালী ইউয়ানের পরিবর্তে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রা চায়। রপ্তানি শক্তিশালী থাকলে সামান্য মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হতে পারে, কিন্তু দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ইউয়ানের বড় ধরনের উত্থান অনুমোদনের সম্ভাবনা কম।