কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে ১২ বছরের মাদরাসাছাত্র মোস্তাকিম হোসেনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আবারও সামনে এনেছে জেলার দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। নদীতে ডুবে কেউ নিখোঁজ হলে স্থানীয়ভাবে উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারলেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পানির নিচে অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব হয় না। ফলে অপেক্ষা করতে হয় খুলনা থেকে বিশেষজ্ঞ ডুবুরি দলের জন্য।
গত ২৮ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার ভাগজোত ঘাটে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সময় পদ্মা নদীতে নিখোঁজ হয় মোস্তাকিম। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল না থাকায় খুলনা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দলটি আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় পরিবারকে। কয়েক ঘণ্টা পর ডুবুরি দল পৌঁছায়। পরদিন সকালে নদী থেকে মোস্তাকিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মোস্তাকিমের মা শিউলি খাতুন বলেন, ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে তাঁর ছেলে নদীতে ডুবে যায়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। খুলনা থেকে লোক আসা পর্যন্ত পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় একাধিক নদী, নেই স্থায়ী ডুবুরি দল
কুষ্টিয়া একটি নদীবেষ্টিত জেলা। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীসহ অন্তত আটটি নদী ও জলপথ জেলার বিভিন্ন এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদী স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, যোগাযোগ ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে নদীগুলো তৈরি করছে পানিতে দুর্ঘটনা ও ডুবে যাওয়ার স্থায়ী ঝুঁকি।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর স্থানীয় কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারলেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও বিশেষ সরঞ্জামের অভাবে পানির নিচে কার্যকর অনুসন্ধান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন খুলনা থেকে ডুবুরি দল চাওয়া হয়। সাধারণত তাদের কুষ্টিয়ায় পৌঁছাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে।
আগস্টেই একাধিক প্রাণহানি
চলতি আগস্টে কুষ্টিয়ার নদীগুলোতে একাধিক ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ৫ আগস্ট দৌলতপুরের মরিচা ইউনিয়নে নদীভাঙনে পদ্মায় পড়ে যায় পাঁচ বছরের নূরি খাতুন ও আট বছরের জামিলা খাতুন। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করলেও নূরি নিখোঁজ ছিল। পরদিন মিরপুর উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
১৪ আগস্ট কুমারখালীর শিলাইদহ ঘাটসংলগ্ন পদ্মা নদী থেকে নিখোঁজ হয় আট বছরের আলিফ হোসেন। একই দিন সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর ১০ দিন পর কুমারখালী পৌরসভার এমএন বাঁধ এলাকায় গড়াই নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে মারা যান ৩৮ বছর বয়সী জেলে পরিমল মণ্ডল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পানিতে ডুবে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়রা নৌকা, মাছ ধরার জালসহ বিভিন্ন উপায়ে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের বিকল্প এসব ব্যবস্থায় হয় না।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেন বলেন, নদীবেষ্টিত হওয়ায় কুষ্টিয়ায় পানিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে দুর্ঘটনার পর খুলনা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় এবং এ নিয়ে প্রায়ই জনরোষের মুখে পড়তে হয়।
তিনি জানান, কুষ্টিয়ায় ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জাতীয় পর্যায়েও বড় সংকট
কুষ্টিয়ার পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামগ্রিক ডুবে মৃত্যুর সংকটেরই একটি অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জুলাই ২০২৬-এ প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৯ হাজার ৬০০ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ডুবে যাওয়া অন্যতম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















