আইন পেশায় প্রতিদিনের কাজের বড় একটি অংশ এমন প্রশাসনিক কাজে চলে যায়, যেখান থেকে সরাসরি কোনো বিলযোগ্য সময় তৈরি হয় না। বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, একজন আইনজীবীর কর্মদিবসের প্রায় ৪৮ শতাংশই প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হতে পারে। ফলে ক্লায়েন্টের কৌশল নির্ধারণ, আদালতের প্রস্তুতি কিংবা আইনি বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দেওয়ার মতো সময় কমে যায়।
দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যা ছিল। কিন্তু এত দিন যে প্রযুক্তিগুলো ছিল, সেগুলো আইন পেশার জটিলতা, গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ছিল না। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
আইন পেশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে
প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে আইন পেশা ঐতিহাসিকভাবেই কিছুটা ধীরগতির। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই চিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৪ সালের আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের আইন-প্রযুক্তি জরিপে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ আইনজীবী জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের কার্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। ২০২৩ সালে এই হার ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যবহার প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের আকার অনুযায়ী ব্যবধানও স্পষ্ট। ৫০০ বা তার বেশি আইনজীবী থাকা প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের হার ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। বিপরীতে একক আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠানে এই হার ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এগিয়ে গেলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সতর্ক। বিশেষ করে মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে অদক্ষতার খরচ তাদের জন্য বড় হলেও ভুল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করাও দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল হতে পারে।
সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বিশেষায়িত আইনি সহকারী

আইন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল পরিবর্তন এসেছে বিশেষায়িত ব্যবস্থার মাধ্যমে। সাধারণ কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আকর্ষণীয় হলেও আইনজীবীদের কাছে সব সময় যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ছিল না। ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ উত্তর যাচাই করতে অনেক সময় লাগত।
নতুন প্রজন্মের আইনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মামলার তথ্য, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মনীতি মেনে চলার কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে বাস্তব কাজে প্রয়োগের পথ অনেক সহজ হয়েছে।
ধরা যাক, একটি মাঝারি আকারের ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ মামলার আইন প্রতিষ্ঠানে সোমবার সকালে তিনজন সম্ভাব্য নতুন ক্লায়েন্টের তথ্য এসেছে। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জবানবন্দির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। দুইজন সহকারী চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ ও ক্ষতিপূরণ দাবির চিঠি তৈরিতে ব্যস্ত। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধান সকাল ১০টার বৈঠকের জন্য মামলাগুলোর অগ্রগতির প্রতিবেদন চাইছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়া এমন পরিস্থিতি সহজেই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যথাযথভাবে সাজানো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী নতুন ক্লায়েন্টের তথ্য থেকে প্রাথমিক সারসংক্ষেপ তৈরি করতে পারে, নির্দিষ্ট মামলার তথ্য ব্যবহার করে দাবিপত্রের খসড়া প্রস্তুত করতে পারে এবং বিদ্যমান মামলার তথ্য থেকে কয়েক মিনিটে অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ নতুন কোনো কাজ তৈরি হচ্ছে না। বরং বারবার করতে হয় এমন প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে আইনজীবীরা তাঁদের সময় বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বোঝার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দিতে পারছেন।
আইনজীবীকে প্রতিস্থাপন নয়, সময় বাঁচানোই মূল লক্ষ্য
আইনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সুবিধা আইনজীবীকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং কোনো কাজের প্রয়োজন দেখা দেওয়া থেকে সেটি আইনজীবীর পর্যালোচনার জন্য প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনা।
যে কাজ আগে দুই ঘণ্টা সময় নিত, সেটি যদি ২০ মিনিটে প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা যায়, তাহলে একটি প্রতিষ্ঠানের শত শত মামলায় তার প্রভাব অত্যন্ত বড় হতে পারে।
তবে এখানে মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খসড়া তৈরি করবে, তথ্য সাজাবে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করবে; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আইনি অনুমোদনের দায়িত্ব আইনজীবীর কাছেই থাকবে।
কেন সব আইন প্রতিষ্ঠান একই গতিতে এগোচ্ছে না
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণে বড় ও ছোট প্রতিষ্ঠানের ব্যবধান শুধু অর্থের কারণে নয়। এর পেছনে তিনটি বড় বাধা রয়েছে—নীতিগত অনিশ্চয়তা, ফলাফলের ওপর আস্থার অভাব এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগের সমস্যা।
কোনো প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতি না থাকলে কর্মীরা প্রযুক্তিটি ব্যবহার করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আবার ফলাফলের নির্ভুলতার ওপর আস্থা না থাকলে আইনজীবীদের প্রতিটি উত্তর অতিরিক্ত সময় নিয়ে যাচাই করতে হয়। এতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় সাশ্রয়ের সুবিধাই অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়।
এর সঙ্গে যদি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান মামলা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ না থাকে, তাহলে নতুন প্রযুক্তি বরং অতিরিক্ত তথ্য প্রবেশের কাজ তৈরি করতে পারে।
যেসব প্রতিষ্ঠান এই তিনটি সমস্যা সমাধান করতে পেরেছে, তারাই সবচেয়ে ভালো ফল পাচ্ছে। অন্যদিকে যারা আংশিকভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, তারা অনেক সময় প্রাথমিক পরীক্ষার পর সেটিকে ব্যর্থ বলে মনে করছে। অথচ সমস্যাটি প্রযুক্তির সক্ষমতায় নয়, বরং সেটিকে প্রতিষ্ঠানের কাজের সঙ্গে যথাযথভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে।
বিনিয়োগের সুফল কোথায় বেশি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের লাভ শুধু সময় বাঁচানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে তিন ধরনের আর্থিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, পুনরুদ্ধার করা বিলযোগ্য সময়। খসড়া তৈরি, নতুন মামলা গ্রহণ এবং নথি পর্যালোচনার মতো কাজ দ্রুত হলে আইনজীবীরা ক্লায়েন্টের জন্য সরাসরি কাজ করার বেশি সময় পান।
দ্বিতীয়ত, সময়ের মূল্য কমিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কমে। নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে কোনো মামলার কাজ শেষ করতে দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক বা ফলাফলনির্ভর মামলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের কাজের সক্ষমতা বাড়ে। একই সংখ্যক কর্মী দিয়ে বেশি মামলা পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। উচ্চসংখ্যক মামলা পরিচালনাকারী ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ, অভিবাসন এবং ফৌজদারি মামলার প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।
কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারে
যেসব আইনি কাজে একই ধরনের প্রক্রিয়া বারবার অনুসরণ করতে হয়, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ, ব্যাপকসংখ্যক ক্ষতিপূরণ দাবি, অভিবাসন এবং ফৌজদারি মামলার মতো ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ নথি সাজানো, সময়রেখা তৈরি, তথ্যের সারসংক্ষেপ করা এবং নির্দিষ্ট কাঠামোয় চিঠি বা নথি প্রস্তুত করার কাজ থাকে।
এসব পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকর। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এর নির্ভরযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। তাই আইনজীবীর পর্যালোচনা ব্যবস্থা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
ব্যবহারের আগে যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি

কোনো আইন প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ব্যবস্থা চালু করার আগে দেখতে হবে সেটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান মামলা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কি না। আলাদা ব্যবস্থায় তথ্য স্থানান্তর করতে হলে সময় সাশ্রয়ের বদলে বাড়তি কাজ তৈরি হতে পারে।
ক্লায়েন্টের তথ্যের মালিকানা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কোনো যৌথ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার প্রশিক্ষণে তা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই জানা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি প্রতিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-উৎপাদিত ফলাফলের জন্য আইনজীবীর পর্যালোচনা ও অনুমোদনের নির্দিষ্ট ধাপ থাকা দরকার। চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত কখনোই অন্ধভাবে যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের আইনজীবী সংগঠনের নির্দেশনা। বিভিন্ন অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়ে পেশাগত মতামত ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাই প্রযুক্তি চালুর আগেই প্রযোজ্য নিয়ম জানা জরুরি।
সামনে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের যে দ্রুত বৃদ্ধি দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায় আইন পেশা এখন আর কেবল প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণের পর্যায়ে নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাস্তব কাজের মধ্যে এসব ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
আগে যারা প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে, তারা শুধু সময় বাঁচাচ্ছে না; তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতাও তৈরি করছে। কোন কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভালো ফল দেয়, কোথায় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, কর্মীদের কীভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে—এসব বিষয়ে সময়ের সঙ্গে তাদের নিজস্ব দক্ষতা তৈরি হচ্ছে।
ফলে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, তা নিয়ে হবে না। বরং কে সেটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে উঠবে।
আইন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশ্নটি তাই আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হবে কি না—এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানটি কি পরিবর্তনের শুরুতেই এগিয়ে গিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়াবে, নাকি অন্য প্রতিষ্ঠান যখন কয়েক ঘণ্টার কাজ কয়েক ঘণ্টার বদলে কয়েক মিনিটে শেষ করবে, তখনও পুরোনো পদ্ধতিতে কাজ করতে থাকবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















