আইন, কর ও পেশাগত সেবার জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা এবার আরও নতুন মাত্রা পেল। Thomson Reuters নিজেদের প্রথম বৃহৎ ভাষা মডেল ‘থমসন’ তৈরি করেছে। এর বিশেষত্ব শুধু নতুন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের আত্মপ্রকাশে নয়; বরং নিজেদের বিপুল আইনি তথ্যভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনায়।
থমসন রয়টার্স জানিয়েছে, মডেলটি পেশাজীবীদের কাজের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এর প্রশিক্ষণে ওয়েস্টল, প্র্যাকটিক্যাল ল, চেকপয়েন্ট ও রয়টার্সের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত তথ্য ও দক্ষতা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মডেল তৈরিতে প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে।
বিপুল তথ্যভাণ্ডারই বড় শক্তি
থমসন রয়টার্সের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত মডেলটি নিজে নয়, বরং মডেলের পেছনে থাকা তথ্যভাণ্ডার। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বহু দশক ধরে সংগৃহীত, সম্পাদিত, শ্রেণিবদ্ধ ও পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বিপুল আইনি তথ্য রয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এখন পর্যন্ত তাদের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডারের ১০ শতাংশেরও কম এই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আরও বিপুল পরিমাণ নিজস্ব তথ্য কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাতাদের কাছে অত্যাধুনিক কম্পিউটিং ক্ষমতা ও শক্তিশালী মডেল থাকলেও নির্ভরযোগ্য ও সম্পাদিত পেশাগত তথ্যের এমন বিশাল ভাণ্ডার তাদের হাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থাকে না। থমসন রয়টার্স এই ব্যবধানকেই নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে।
পেশাজীবীদের জন্য ‘বিশ্বস্ত’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
প্রতিষ্ঠানটি ‘থমসন’কে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে উপস্থাপন করছে, যার উত্তর যাচাই করা, নিরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে প্রমাণ করা সম্ভব হবে।
আইনি পেশায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল আইনি নজির, অস্তিত্বহীন মামলার উল্লেখ কিংবা ভুল তথ্য আদালতে উপস্থাপন করলে আইনজীবীদের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, পেশাগত কাজের জন্য এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দরকার, যার উত্তরের ভিত্তি ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়।
পরীক্ষায় কেমন ফল
থমসন রয়টার্সের নিজস্ব পরীক্ষায় ‘থমসন’ বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ফল দেখিয়েছে। আইনি ও পেশাগত বিভিন্ন পরীক্ষায় এটি ক্লদ ওপাস, জিপিটি-৫.৫ এবং জেমিনি ৩.১ প্রোর মতো মডেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
তবে এসব ফলাফলকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ পরীক্ষাগুলোর বড় অংশই প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
স্বাধীন পরীক্ষার সুযোগও ইতোমধ্যে তৈরি হচ্ছে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক জোনাথন চোই কঠিন করপোরেট করসংক্রান্ত প্রশ্নে ‘থমসন’কে চ্যাটজিপিটি ও ক্লদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মূল্যায়নে ‘থমসন’-এর উত্তর সামগ্রিকভাবে বেশি পছন্দ হয়েছে, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থের সঙ্গে সংযোগের কারণে।
কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্নেল লিগ্যাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের অধ্যাপক স্যামুয়েল দাহানও এর উদ্ধৃতি দেওয়ার মানকে শীর্ষস্থানীয় মডেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বলে মন্তব্য করেছেন।
কেন নিজস্ব মডেলের পথে থমসন রয়টার্স
এর পেছনে প্রযুক্তির পাশাপাশি রয়েছে বড় অর্থনৈতিক হিসাব।
থমসন রয়টার্স ইতোমধ্যে বাইরের বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। তাদের কো-কাউন্সেল লিগ্যাল ব্যবস্থাতেও বাইরের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি একাধিক মডেলকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর কৌশল অনুসরণ করছে।
কিন্তু অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ভাড়া করে ব্যবহার করার ঝুঁকিও রয়েছে। সরবরাহকারী চাইলে দাম বাড়াতে পারে, মডেল পরিবর্তন করতে পারে কিংবা একসময় নিজেই আইনি প্রযুক্তির বাজারে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রবেশ করতে পারে।
বর্তমানে সেই আশঙ্কা আর নিছক কল্পনা নয়। অ্যানথ্রপিক আইনি কাজের ক্ষেত্রে দ্রুত এগোচ্ছে। গুগলও আইনজীবীদের জন্য নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করছে।
ফলে নিজস্ব মডেল থমসন রয়টার্সকে প্রযুক্তি, ব্যয় এবং পণ্যের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেবে।
কো-কাউন্সেলেই প্রথম ব্যবহার
‘থমসন’কে কেবল গবেষণাগারে রেখে দেওয়া হচ্ছে না। এর প্রথম ব্যবহার হবে কো-কাউন্সেল লিগ্যালের নথি বিশ্লেষণ ব্যবস্থায়।
এই ব্যবস্থায় আইনজীবীরা একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১০ হাজার নথি পর্যালোচনা করতে পারবেন এবং সেগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০০টি প্রশ্ন করতে পারবেন।
তবে কো-কাউন্সেল পুরোপুরি ‘থমসন’-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে না। থমসন রয়টার্স জানিয়েছে, বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করা হবে। যেখানে ‘থমসন’-এর বিশেষ দক্ষতা বেশি কার্যকর, সেখানে সেটি ব্যবহার করা হবে; অন্য কাজের জন্য অন্যান্য উন্নত মডেলও থাকবে।
আইনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে এ ধরনের বহু-মডেল পদ্ধতিই সম্ভবত বাস্তবসম্মত। কারণ একটি মডেল সব ধরনের পেশাগত কাজেই সেরা হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বদলে যাচ্ছে আইনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা
‘থমসন’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর প্রযুক্তিগত ক্ষমতা নয়। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, আইনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
আগে প্রশ্ন ছিল—কার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল আছে? এখন প্রশ্ন হয়ে উঠছে—কার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান তথ্য, পেশাগত কাজের প্রবাহ এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে?
থমসন রয়টার্সের কৌশলটি দাঁড়াচ্ছে তিনটি স্তম্ভের ওপর—নিজস্ব তথ্য, পেশাগত প্ল্যাটফর্ম এবং সেই তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
এটি বিশেষ করে সেই সব আইনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, যাদের প্রধান প্রযুক্তিগত সুবিধা অন্য প্রতিষ্ঠানের মডেলের ওপর তৈরি আকর্ষণীয় ব্যবহারব্যবস্থা বা ইন্টারফেস।
আইনজীবীদের জন্য এর অর্থ কী
আইনজীবী ও আইন প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অসংখ্য ব্যবস্থা। কোনটি ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ করাই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে থমসন রয়টার্সের নিজস্ব মডেল তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কারণ এটি শুধু কথোপকথন বা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পেশাগত তথ্যভাণ্ডার ও আইনি কাজের ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় কে এগিয়ে থাকবে, তা হয়তো নির্ধারণ করবে না কোন মডেল এই মাসের পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পেল। বরং নির্ধারণ করবে কোন প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য তথ্য, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে একত্র করতে পারছে।
থমসন রয়টার্সের নতুন উদ্যোগ সেই লড়াইয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















