বাংলাদেশ ও আসাম অঞ্চল বহু শক্তিশালী ভূমিকম্পের সাক্ষী। তবে ১৭৮৭ সালের মহাভূমিকম্পে ঘটে যায় এক বিস্ময়: ব্রহ্মপুত্র নদ তার প্রাচীন প্রবাহপথ ছেড়ে পুরোপুরি নতুন পথে বয়ে চলা শুরু করে। এই পরিবর্তন শুধু নদীর নয়—আঞ্চলিক ভূগোল, কৃষি, বাণিজ্য, যোগাযোগ এমনকি জনবসতির মানচিত্রও পাল্টে দেয়।
এই ভূমিকম্পের ফলে এক ব্রহ্মপুত্র নদী দুটি নদী হয়ে যায়
(১) পুরোনো ব্রহ্মপুত্র
(২) নতুন ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা
নীচে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হলো কোথায় ছিল পুরোনো পথ, কীভাবে নতুন পথ তৈরি হলো, এবং কেন এটি ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা।
১৭৮৭ সালের মহাভূমিকম্প: যে দিন নদীর দিক পাল্টে গেল
১৮শ শতকের শেষভাগে সংঘটিত এই ভূমিকম্প আধুনিক মাপ অনুযায়ী রিখটার স্কেলে ৮ বা তারও বেশি ছিল বলে ধারণা। ভূত্বকের বিশাল চাপ সরে যাওয়ায় নদীর তীর ভেঙে পড়ে, ভূমি দেবে যায় এবং পুরোনো চ্যানেলগুলো ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে ব্রহ্মপুত্র হঠাৎই নতুন পথ বেছে নেয়।
এই ঘটনাকেই বলা হয় River Avulsion — অর্থাৎ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ হঠাৎ বদলে ফেলা।
পুরোনো ব্রহ্মপুত্র কোথায় ছিল?
ভূমিকম্পের আগে ব্রহ্মপুত্রের প্রধান প্রবাহ বাংলাদেশে ঢুকে যেসব পথ ধরে যেত, তা হলো—
১. ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ:
- নদী শিলচর ও করোতোয়া অঞ্চল পেরিয়ে কিশোরগঞ্জের নিকলী ও ভৈরব অঞ্চলে পৌঁছাত।
- এটিই ছিল প্রধান প্রবাহ।
২. বাংলাদেশের ভেতরে প্রবাহের দিক:
পুরোনো ব্রহ্মপুত্র চলত—
- কিশোরগঞ্জ
- ময়মনসিংহ
- নেত্রকোনা
- শেরপুর
এই প্রবাহ আরও দক্ষিণে গিয়ে সংযুক্ত হতো—
- মেঘনা নদীর সঙ্গে
- ভৈরব বাজারের কাছে

৩. আজ এই পথকে কেন ‘পুরোনো ব্রহ্মপুত্র’ বলা হয়?
কারণ ভূমিকম্পের পর এ পথ উল্লেখযোগ্যভাবে সরু হয়ে যায়।
স্রোত কমে যায়, নাব্যতা কমে যায়, এবং ব্রহ্মপুত্রের মূল জলরাশি এই পথ ছেড়ে নতুন পথে প্রবাহিত হতে থাকে।
আজও এই নদী প্রবাহ আছে—তবে নাম:
পুরানো ব্রহ্মপুত্র
এটি এখন অপেক্ষাকৃত শান্ত ও সরু নদী।
নতুন ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা কোথায়?
১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পের পর ব্রহ্মপুত্র প্রবাহ হঠাৎ সরে যায় পশ্চিম দিকে।
১. নতুন প্রবেশপথ:
ভারত থেকে নদী এখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে—
- কুড়িগ্রাম
- চিলমারী
- উলিপুর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে।
২. নদীর ভেতরে নতুন পথ:
এই নতুন পথ তৈরি করে আজকের যমুনা নদী। যমুনার প্রবাহ বাংলাদেশে বিস্তৃত—
- কুড়িগ্রাম
- গাইবান্ধা
- জামালপুর
- সিরাজগঞ্জ
- বগুড়া (দক্ষিণাংশ)
৩. পদ্মার সঙ্গে মিলন:
যমুনা নদী দক্ষিণে নেমে রাজবাড়ী অঞ্চলে এসে মিলিত হয়—
- পদ্মা নদীর সঙ্গে।
এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী নদীব্যবস্থার একটি।
৪. কেন এটিকে নতুন ব্রহ্মপুত্র বলা হয়?
কারণ—
এটিতেই এখন ব্রহ্মপুত্রের প্রধান জলরাশি প্রবাহিত হয়।
এ নদীর প্রবাহ এত শক্তিশালী যে এটি দেশের নদীভূমিকে বারবার নতুন করে গড়ে তোলে।
অর্থাৎ—
নতুন পথ = যমুনা নদী
পরিবর্তনের কারণ: বিজ্ঞান কী বলছে
১. ভূমিকম্পের পর ভূমিধস
নদীর তীর ভেঙে পড়ে, পুরোনো চ্যানেল ব্লক হয়ে যায়।
২. ভূমির দেবে যাওয়া
ভূমির উচ্চতা হঠাৎ বদলে যাওয়ায় পানি সহজে নতুন, ঢালু পথে গড়িয়ে পড়ে।

৩. নতুন জলপ্রবাহের শক্তি
নতুন পথ একবার তৈরি হলে প্রবল স্রোত সেটিকে আরও প্রশস্ত করে তোলে।
ফলাফল: ব্রহ্মপুত্র তার ঐতিহ্যবাহী পথ ছেড়ে নতুন শক্তিশালী যমুনা চ্যানেলকে বেছে নেয়।
মানুষের জীবনে এই পরিবর্তনের প্রভাব
১. গ্রাম-শহর হারানো ও নতুন চর গঠন
পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের তীরে থাকা অসংখ্য গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে যায়। একই সময়ে নতুন পথে বিশাল চর সৃষ্টি হয়।
২. কৃষির ধরন বদলে যায়
যমুনার দু’পারে ভাঙন ও বন্যার প্রকৃতি বদলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. বাণিজ্য ও নৌ-পথে বড় পরিবর্তন
যেসব শহর আগে নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিল, তারা পিছিয়ে পড়ে। নতুন নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠে নতুন হাট-বাজার।
৪. আঞ্চলিক জনবসতির পুনর্বিন্যাস
ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের গুরুত্ব কমে যায়, বিপরীতে সিরাজগঞ্জ–জামালপুর–গাইবান্ধা অঞ্চলে নতুন জনবসতি বিস্তৃত হয়।
১৭৮৭ সালের মহাভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
একই দেশের ভেতর দুই ব্রহ্মপুত্র—
পুরোনো ব্রহ্মপুত্র
এবং
নতুন ব্রহ্মপুত্র/যমুনা
—এই পরিবর্তনেরই জীবন্ত প্রমাণ।
আজকের বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী নদীযন্ত্র—যমুনা—গঠিত হয়েছিল সেই এক ভূকম্পীয় ধাক্কায়।
এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়:
প্রকৃতি কখনোই স্থির নয়; এক মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে পুরো মানচিত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















