সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫—মাত্র ১৩ মাসে বাংলাদেশে খুনের ঘটনা যেন এক ভয়ংকর স্বাভাবিকতায় স্থায়ী হয়ে গেছে। কখনও প্রকাশ্যে দোকানে ঢুকে গুলি, কখনও গলির ভেতর পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে দেওয়া, কখনও রাস্তায় গণপিটুনি—ফলাফল একই: প্রতিদিন গড়ে দশজনেরও বেশি মানুষ নিহত। এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, লিঞ্চিং আর বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
সংখ্যার হিসাব: এক বছরে কত মানুষ খুন?
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর—১৩ মাসে দেশজুড়ে খুনের সংখ্যা তিন হাজার চারশর বেশি। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি–নভেম্বর ১১ মাসেই খুনের মামলা হয়েছে ৩,৫০৯টি। প্রতিদিন এতে নিহত হয়েছেন ১০ জনেরও বেশি মানুষ।
এই সময় ৯৯৯-এ মারামারি ও সংঘর্ষ সংক্রান্ত ৭৯ হাজারের বেশি কল এসেছে। এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে বোঝা যায়—অপরাধ, খুন এবং সহিংস প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
২০২৪ সালের শেষ চার মাসের খুন ও সহিংসতার ঘটনা যোগ করলে সামগ্রিক চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
প্রকাশ্যে গুলি, পাথর, ছুরি: ঢাকার দুই লোমহর্ষক ঘটনা
মিরপুরে দোকানে ঢুকে গুলি
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মিরপুর সি-ব্লকের একটি দোকানে ঢুকে দুর্বৃত্তরা যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। দোকানের ভেতরে স্বাভাবিক কথাবার্তা চলছিল, এমন সময় হেলমেট–পরিহিত কয়েকজন ঢুকে কয়েক সেকেন্ডেই গুলি চালিয়ে বেরিয়ে যায়।

পালানোর সময় তারা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালককেও গুলি করে আহত করে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার এত কাছেই থানা ও পুরোনো ফাঁড়ি—তবু কাউকে থামানোর সাহস কেউ দেখায়নি।
মিটফোর্ডের গলিতে পাথর মেরে হত্যা
এর কয়েক মাস আগে পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে ৯ জুলাই সকালে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে প্রথমে ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে, পরে বড় পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়—মাটিতে ফেলে কয়েকজন বারবার পাথর তুলছে, সোহাগ আর নড়াচড়া না করলেও আঘাত থামছে না। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, পরে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই দুই ঘটনাই কেবল প্রকাশ্যে সংঘটিত অসংখ্য হত্যার মাত্র দুটি উদাহরণ—যেগুলো আলোচিত হওয়ায় মানুষের সামনে এসেছে।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা: ১০ মাসে অন্তত ১৪০ মৃত্যু
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির কমপক্ষে ২৫৬টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪০ জন, আহত হয়েছেন ২৩১ জন।
২০২৩ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন, ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জনে—যা এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
২০২৫ সালে প্রথম আট মাসেই লিঞ্চিংয়ের শিকার হয়েছেন আরও ১২৪ জন।
এ সময় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এক মাসে ২০টিরও বেশি লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ঘটে—যা কোনো দেশের ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সময়জুড়ে এসব ঘটনার হার কয়েকগুণ বেড়ে স্থায়ী উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা: এক বছরে অন্তত ১৬০ মৃত্যু
সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫—১৩ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬০ জন।
এই সময়ে সংঘর্ষ হয়েছে অন্তত ১,০৪৭টি, আহত হয়েছেন আট হাজারেরও বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিএনপি–সংশ্লিষ্ট কর্মী; এরপর আওয়ামী লীগ, জামায়াত, পাহাড়ি সংগঠন ও অন্যান্য দল–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও রাজনৈতিক সহিংসতার ধরনে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। দলীয় কোন্দল, কমিটি–সংক্রান্ত বিরোধ এবং এলাকা দখল–কেন্দ্রিক সংঘর্ষই অধিকাংশ হত্যার কারণ।

বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রসফায়ার: এক বছরে অন্তত ৪০ মৃত্যু
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর—১৩ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যায় প্রাণ গেছে অন্তত ৪০ জনের। এর মধ্যে ক্রসফায়ার ও হেফাজতে মৃত্যু—দুই ধরনের ঘটনাই রয়েছে।
নতুন সরকার এলেও বন্দুকযুদ্ধ বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা পুরোপুরি থামেনি—শুধু মাত্রা কিছুটা কমেছে।
#Bangladesh #Killings #MobViolence #PoliticalViolence #HumanRights
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















