গুয়ামের উপকূলের গভীর সমুদ্রে সূর্যের আলো পৌঁছায় খুব অল্প। পানির নিচে তিনশ ফুটেরও বেশি গভীরে সেই আলো মানুষের চোখে দিনের মাঝেও গোধূলির মতো মনে হয়। এই স্তরকে বলা হয় সমুদ্রের উপরের গোধূলি অঞ্চল। পৃথিবীর সবচেয়ে কম অনুসন্ধান করা বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি এই অঞ্চল, যেখানে পৌঁছাতে লাগে সাবমেরিন, দূরনিয়ন্ত্রিত যান কিংবা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গভীর সমুদ্র ডুবুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের একদল বৈজ্ঞানিক ডুবুরি ঝুঁকিপূর্ণ গভীর ডাইভ সম্পন্ন করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল গুয়ামের গভীর প্রবালপ্রাচীরে আটকে থাকা পর্যবেক্ষণ যন্ত্র উদ্ধার করা, যেগুলো আট বছরের বেশি সময় ধরে সামুদ্রিক প্রাণ ও পানির তাপমাত্রার তথ্য সংগ্রহ করছিল।

গভীর ডুব আর অজানা প্রাণ
এই অভিযানে ডুবুরিরা এমন এক জগৎ দেখতে পান, যেখানে রয়েছে নরম প্রবাল, ঝিলমিল করা কৃমি, কাঁটাযুক্ত সামুদ্রিক শামুক আর লোমশ কাঁকড়ার মতো বিচিত্র প্রাণ। উদ্ধার করা যন্ত্রগুলো আসলে কৃত্রিম প্রবালপ্রাচীরের মতো, যেখানে নানা সামুদ্রিক প্রাণ আশ্রয় নিয়ে বেড়ে ওঠে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এগুলো যেন পানির নিচে ছোট ছোট বাসস্থান।
বিশেষ যন্ত্রে শ্বাস আর সময়ের লড়াই
এত গভীরে সাধারণ ডুবসাঁতার সরঞ্জাম কাজে আসে না। এখানে ডুব দিতে হয় হিলিয়াম ও বাতাসের বিশেষ মিশ্রণে। গভীরে নামার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে গ্যাস জমে, যা ধীরে ধীরে বের না হলে ডুবুরি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তাই উপরে উঠতেও লাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে কাজের জন্য হাতে থাকে মাত্র অল্প সময়।

নতুন প্রজাতির ইঙ্গিত
গুয়ামের সামুদ্রিক গবেষণাগারে যন্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার নমুনা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে শতাধিক প্রাণ এই অঞ্চলে আগে কখনও নথিভুক্ত হয়নি। প্রায় বিশটি নমুনাকে সম্ভাব্য নতুন প্রজাতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের কার্ডিনাল মাছ, কমলা নখওয়ালা কাঁকড়া এবং হলুদ ও গোলাপি ছোপ দেওয়া সামুদ্রিক শামুক। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে এমন এক হার্মিট কাঁকড়া, যা শামুকের খোলস নয়, ঝিনুকের খোলসে বাস করে।
গভীর সাগরেও মানুষের ছাপ
এই আবিষ্কারের আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগও বাড়ছে। গবেষকেরা বলছেন, গভীর এই প্রবালপ্রাচীরের অর্ধেকের বেশি প্রাণ এখনও অজানা, অথচ এখানেও দেখা যাচ্ছে মাছ ধরার জাল থেকে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য। গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে এই দূষণের মাত্রা বেড়েছে, যা মানুষের উপস্থিতির স্পষ্ট চিহ্ন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত
পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের তাপমাত্রা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গভীর সাগরের পানিও উষ্ণ হচ্ছে। একসময় ধারণা ছিল, এই গভীরতা হয়তো উষ্ণতা থেকে নিরাপদ আশ্রয় হবে। নতুন তথ্য সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমুদ্রের সবচেয়ে গোপন স্তরেও পৌঁছে গেছে।
এই অভিযান শুরু মাত্র। আগামী দুই বছরে প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন এলাকায় আরও বহু পর্যবেক্ষণ যন্ত্র উদ্ধার করা হবে। বিজ্ঞানীদের আশা, এতে সমুদ্রের গোধূলি জগতের জীবন ও তা রক্ষার পথ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা মিলবে।





সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















