দেশে সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা আছে এক হাজার ২৫৩ টাকা। বাস্তবে এই সিলিন্ডার এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে শুরু করে দুই হাজার ১০০ টাকায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক বছর ধরেই নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যায় না, তবে এবার দাম বাড়ার মাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
দাম বাড়ার বাস্তব চিত্র
গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে এলপিজির দাম লাগাতার বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা, বিক্রেতা ও পরিবেশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর রামপুরায় এক বাসিন্দা ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন এক হাজার ৭৫০ টাকায়। পরদিন মুগদায় দাম ছিল এক হাজার ৮০০ টাকা, টাঙ্গাইলে এক হাজার ৮৫০ টাকা এবং মোহাম্মদপুরে গিয়ে দাম উঠেছে দুই হাজার ১০০ টাকায়। অধিকাংশ ক্রেতাই অভিযোগ করেছেন, বেশি দামে কেনার পরও বিক্রেতারা কোনো রসিদ দেননি।

সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরের চিত্র
দেশে রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। এই গ্যাস আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতা হয়ে গ্রাহকের হাতে পৌঁছায়। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে।
বিশ্ববাজার ও আমদানির প্রভাব
বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজ সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। গত মাসে আমদানির পরিমাণ কমে গেছে, যার প্রভাব এখন বাজারে স্পষ্ট। যদিও প্রকৃত অর্থে দেশে এলপিজির বড় কোনো সংকট নেই, তবু সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা দেখিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুচরা বিক্রেতাদের অবস্থান

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত চাহিদা দিলেও পর্যাপ্ত এলপিজি পাচ্ছেন না। ফলে ক্রেতারা চাইলেও সিলিন্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, আর সেই বাড়তি দামের বোঝা ক্রেতাদের ওপরই চাপানো হচ্ছে।
ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ের সংকট
এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশকরা বলছেন, অনেক অপারেটর কোম্পানি এখন সরবরাহ সীমিত করে দিয়েছে। এক হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে মিলছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টি। তাও প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য অতিরিক্ত ৭০ থেকে ৮০ টাকা গুনতে হচ্ছে। ট্রাক নিয়ে কোম্পানির সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। এর ফলে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটররা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতারাও বাড়তি মুনাফা যোগ করে আরও বেশি দামে বিক্রি করছেন।

শীতকাল ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়, ফলে দামও কিছুটা বাড়ে। এবার এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমদানির জাহাজ সংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত বেশ কিছু জাহাজ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় আমদানি আরও কমে গেছে। এসব কারণে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কায় আগেভাগেই দাম বাড়াচ্ছেন বিক্রেতারা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা
এই অবস্থায় প্রতি মাসের নিয়ম অনুযায়ী আগামী রবিবার এলপিজি ও অটোগ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। তবে বাস্তবতা হলো, ঘোষিত দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায় না বলেই অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















