উনিশ শতকের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকার রাজনীতি একটিই প্রশ্ন ঘিরে ঘুরেছে—নিজেদের দেশ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা, এই অঞ্চলের ইতিহাস গড়ে উঠেছে প্রতিরোধ আর আপসের দ্বন্দ্বে। আদর্শে ভিন্ন হলেও যাঁরা জনগণের স্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তাঁরা ইতিহাসে বীর হিসেবে স্মরণীয়। আর যাঁরা বিদেশি শক্তির সঙ্গে আপস করে ক্ষমতা টিকিয়ে ছেন, তাঁদের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে বিতর্কিত ও ক্ষতবিক্ষত।

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ
স্পেনের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে উনিশ শতকের শুরুতে যে বিদ্রোহ শুরু হয়, তার নেতৃত্বে ছিলেন ধর্মযাজক মিগেল ইদালগো। মেক্সিকো স্বাধীনতার ডাক দিয়ে তিনি দাসপ্রথা বিলোপ ও আদিবাসীদের জমি ফেরানোর ঘোষণা দেন। প্রাণের বিনিময়ে সেই আন্দোলনকে তিনি ইতিহাসে স্থায়ী করে যান। তাঁর পথ অনুসরণ করেন হোসে মারিয়া মোরেলোস, যিনি দাসত্ব ও জাতিগত বৈষম্য বিলোপের কথা লিখিত আকারে তুলে ধরেন এবং জনগণের সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে প্রস্তাব করেন।
এই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম সিমন বলিভার। একাধিক দেশকে স্পেনের হাত থেকে মুক্ত করে তিনি কেবল স্বাধীনতা নয়, একটি ঐক্যবদ্ধ দক্ষিণ আমেরিকার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর্জেন্টিনা, চিলি ও পেরুর মুক্তিযুদ্ধে হোসে দে সান মার্তিনের ভূমিকা একইভাবে স্মরণীয়। এই নেতাদের স্মৃতি আজও জাতীয় পরিচয়ের অংশ।
বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

বিশ শতকে ইউরোপের জায়গা নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই সময়েই নতুন রূপে ফিরে আসে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। মেক্সিকোর বিপ্লবে পাঞ্চো ভিলা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেন। নিকারাগুয়ায় আগুস্তো সানদিনো দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিরোধ আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় পরিণত হন।
চিলিতে সালভাদোর আলেন্দে গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্রের চেষ্টা করেন। শিল্প জাতীয়করণ ও সামাজিক সংস্কারের এই উদ্যোগের পরিণতি হয় সামরিক অভ্যুত্থান। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদেই তাঁর মৃত্যু লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক স্মৃতিতে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে থাকে।
কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাসন উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজ তেলসহ কৌশলগত খাত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নেন। তাঁর উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো তীব্র নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার দাবি করেন।

আপস ও বিশ্বাসঘাতকতার অধ্যায়
অন্যদিকে ইতিহাসে আছে ভিন্ন ধারা। নিকারাগুয়ায় আনাস্তাসিও সোমোসা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ক্ষমতায় এসে ব্যক্তিগত লুটপাট ও দমননীতি চালান। কিউবায় ফুলহেনসিও বাতিস্তা বিদেশি করপোরেশন ও অপরাধী চক্রের স্বার্থ রক্ষা করে দেশকে বৈষম্য ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেন।
হাইতিতে দুভালিয়ের পরিবার সন্ত্রাস ও দুর্নীতির শাসন কায়েম করে। পেরুতে ফুজিমোরি অর্থনৈতিক সংস্কারের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জোরপূর্বক নির্বীজন কর্মসূচি চালান। গুয়াতেমালায় একের পর এক শাসক বিদেশি কোম্পানির স্বার্থে জমি ও সম্পদ তুলে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলায় হুয়ান গুয়াইদোর আত্মঘোষিত ক্ষমতার দাবি বিদেশি সমর্থন থাকলেও দেশের ভেতরে কার্যকর হয়নি।

ইতিহাসের রায়
লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক স্মৃতি নির্মমভাবে স্পষ্ট। যাঁরা বিদেশি শক্তির ওপর ভর করে ক্ষমতায় থেকেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বিস্মৃত বা নিন্দিত হয়েছেন। আর যাঁরা প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছেন, তাঁদের জীবন প্রায়ই শেষ হয়েছে সহিংসতায়, কিন্তু ইতিহাসে তাঁরা রয়ে গেছেন মর্যাদা ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। এই দীর্ঘ লড়াই আজও চলমান, যেখানে সার্বভৌমত্ব মানে কেবল সীমান্ত নয়, নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণের অধিকার।

















সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















