ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে—এমন দাবি করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই দাবি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ফলে সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানকে ঘিরে হুমকির বাস্তবতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে ট্রাম্পের সরাসরি অভিযোগ
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা “খুব শিগগিরই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারবে।” একই বক্তব্য তিনি সাম্প্রতিক ভাষণেও পুনরাবৃত্তি করেন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে তার এই মন্তব্যের পরপরই বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

গোয়েন্দা মূল্যায়নে ভিন্ন চিত্র
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার একটি উন্মুক্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান চাইলে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিকভাবে কার্যকর আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার লক্ষ্যে সক্রিয় কোনো কর্মসূচি চালাচ্ছে—এমন তথ্য গোয়েন্দা মহলে নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্য।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অর্থাৎ অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার মতো সক্ষমতা অর্জনের প্রমাণ এখনো মেলেনি।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, ইরান একটি দেশ যা প্রকাশ্যে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান দেয়। তাই তাদের হাতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থাকা যে বড় উদ্বেগের বিষয়—প্রেসিডেন্ট সেই আশঙ্কাই তুলে ধরেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইরান অবশ্যই একদিন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র অর্জনের পথে এগোচ্ছে। যদিও তিনি গোয়েন্দা মূল্যায়ন নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার ভাষ্য, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়া একটি বড় সমস্যা।
ইরানের পাল্টা বক্তব্য
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ইচ্ছাকৃতভাবে দুই হাজার কিলোমিটারে সীমিত রাখা হয়েছে। তার মতে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র কেবল প্রতিরক্ষার জন্য, আক্রমণের জন্য নয়। দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অভিযোগ তিনি নাকচ করেন।

পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে নতুন প্রশ্ন
ক্ষেপণাস্ত্র বিতর্কের পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। মার্কিন প্রশাসনের এক বিশেষ দূত দাবি করেছেন, ইরান শিল্পমাত্রার বোমা তৈরির উপকরণ অর্জনের খুব কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে। যদিও গোয়েন্দা সূত্র ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাস্তবে সেই সক্ষমতা অর্জনে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে।
একটি সূত্র জানায়, ইরান ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এসব কার্যক্রম এমন স্থানে হচ্ছে, যেগুলো সামরিক হামলায় সহজে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
ওয়াশিংটন ও তেহরানের সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো মূলত পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি আরও বেড়েছে। ফলে সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















