মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। ১ মার্চ ইসরায়েল জানায়, তারা ইরানের ওপর আরও একটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান পাল্টা আঘাত হানলে ভয়াবহ শক্তি প্রয়োগ করা হবে।
খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত
দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ২৮ ফেব্রুয়ারি চালানো বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করে। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দোলরহিম মুসাভিও নিহত হয়েছেন বলে ইরান টেলিভিশন জানায়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, হামলার সময় খামেনি তার কার্যালয়ে কাজ করছিলেন। এ ঘটনায় তার মেয়ে, নাতি-নাতনি ও ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্যরাও প্রাণ হারান।
অস্থায়ী নেতৃত্ব ও কঠোর বার্তা
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি ঘোষণা দেন, দেশ পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানকে ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি জরুরি বৈঠকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। তিনি ইরানের পাল্টা হামলাকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নষ্ট হয়ে গেছে।
ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ইরান যদি আরও কঠোর হামলার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এমন শক্তি প্রয়োগ করবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। তিনি দাবি করেন, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিনের হুমকির অবসান ঘটানো।
মার্কিন সূত্র জানায়, খামেনি ও তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের বৈঠকের সময় লক্ষ্য করেই হামলার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত সংঘাত
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, ইসরায়েলের শহর এবং ওয়াশিংটনের মিত্র আরব দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল হয়।
১ মার্চ দুবাই ও দোহায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দুবাইয়ের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের ধোঁয়া দেখা যায় এবং জেবেল আলি বন্দরের ওপর কালো ধোঁয়া উড়তে থাকে। এর আগে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, চারজন আহত হন। আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক এশীয় নাগরিক নিহত ও সাতজন আহত হওয়ার খবর প্রথমে প্রকাশ হলেও পরে তা মুছে ফেলা হয়।
ওমানেও প্রথমবারের মতো হামলা হয়। দুকম বন্দর এলাকায় দুটি ড্রোন আঘাত হানে, একজন শ্রমিক আহত হন। মাসান্দাম উপদ্বীপের কাছে পালাউ পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘স্কাইলাইট’ আক্রান্ত হয় বলে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলেও সাইরেন বাজতে থাকে এবং তেল আবিবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত সাতজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খামেনি ও শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যু বড় ধাক্কা হলেও ইরানের দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ও প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়বে না।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, সরকার সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘লাল রেখা অতিক্রম করেছে’, যার ফল ভোগ করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বিমানবন্দরগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়। দুবাই ও দোহা ইউরোপ-এশিয়া সংযোগের কেন্দ্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিমান সূচি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়।
এ ছাড়া জ্বালানি পরিবহনেও বড় প্রভাব পড়ে। তেহরান ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এতে তেলের দামে বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস বৈঠকে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় বিবেচনা করতে পারে বলে জানা গেছে, কারণ বহু জাহাজ মালিক ও জ্বালানি কোম্পানি প্রণালী দিয়ে পরিবহন স্থগিত করেছে।
সংঘাতের এই বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















