যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার ভোরে ইরানের বিভিন্ন শহরে সমন্বিত সামরিক হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক সূত্রের ভাষ্য, কয়েক মাসের ঘনিষ্ঠ যৌথ পরিকল্পনার ফল এই অভিযান। হামলার পরপরই তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে এবং দুবাইয়ে সব ধরনের বিমান চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
সমন্বিত হামলার ঘোষণা
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তারা ইরানের বিরুদ্ধে ‘পূর্বপ্রস্তুতিমূলক’ হামলা চালিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ওয়াশিংটনও ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। ইসরায়েলি সূত্র দাবি করে, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, প্রেসিডেন্ট এবং সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব।
স্যাটেলাইট চিত্রে তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কমপ্লেক্স এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময় খামেনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্কুলে হামলার অভিযোগ
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব এলাকায় একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় অন্তত ৫৭ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৪। বহু শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলেও জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। পেন্টাগন জানায়, তাদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ার করার মতো তথ্য নেই। শনিবার ইরানে সাপ্তাহিক শিক্ষার প্রথম দিন ছিল।
তেহরানের পাল্টা হামলা
হামলার দুই ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। ইরান একযোগে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ডজনখানেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি, কুয়েতের আল-সালেম, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা, বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটি এবং জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে ইরানি গণমাধ্যমের দাবি। আবুধাবিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর ধ্বংসাবশেষে একজন নিহত হয়েছেন।
দুবাইয়ে পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। জাবাল আলি বন্দরের কাছে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। হামলা নাকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাধা—তা স্পষ্ট নয়।
মার্কিন দূতাবাসগুলোর সতর্কতা
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাসগুলো নিজ নিজ দেশে অবস্থানরত নাগরিকদের আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও জর্ডানে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সামরিক অভিযানকে “বৃহৎ ও চলমান” বলে বর্ণনা করেন। তিনি সতর্ক করেন, মার্কিন প্রাণহানি ঘটতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের জনগণের প্রতি আহ্বান জানান নিজেদের সরকারকে “দখলে নেওয়ার” জন্য।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পুনরায় পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার করার চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান বরাবরই বলছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বিতর্ক
মার্কিন সিনেটের একাধিক ডেমোক্র্যাট সদস্য এই হামলা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বৃহৎ সামরিক অভিযান চালানো সংবিধানসম্মত নয়। প্রশাসনের কাছে আইনি ভিত্তি, চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং কৌশলগত পরিকল্পনা স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও স্পেন পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য ভয়াবহ হবে।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন জানালেও বেলজিয়াম কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিউবা হামলার নিন্দা করেছে। জাপান জানিয়েছে, পরিস্থিতি তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ওমান, যা সাম্প্রতিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে আরও জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিমান চলাচল স্থগিত
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দুবাইয়ের দুটি প্রধান বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইউরোপীয় বিমান চলাচল সংস্থা মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরের আকাশপথে উড্ডয়ন স্থগিতের পরামর্শ দিয়েছে।
লুফথানসা, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ভার্জিন আটলান্টিক, ইতালির আইটিএ এয়ারওয়েজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তেল আবিব, দুবাই ও বাহরাইনের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে।
ক্ষমতার প্রতীক স্থাপনায় আঘাত
তেহরানে খামেনির কমপ্লেক্স, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, সেখানে হামলা বড় ধরনের প্রতীকী বার্তা বহন করছে। বহু ইরানির কাছে এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র। সেখানে আঘাত হানাকে বিশ্লেষকরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার কাঠামোর হৃদয়ে সরাসরি বার্তা হিসেবে দেখছেন।
উত্তেজনা বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। নতুন করে আরেক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















