ইরানের বিরুদ্ধে ‘বৃহৎ ও চলমান’ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অনিশ্চয়তার দরজা খুলে দিলেন। কয়েক সপ্তাহের ভাবনা–চিন্তা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তিনি। নিজের বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই অভিযানে মার্কিন প্রাণহানির ঝুঁকিও রয়েছে। তবু তাঁর দাবি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ।
ইরানে বৃহৎ সামরিক অভিযান ঘোষণা
শনিবার ভোরে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের ‘উগ্র ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থা’কে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে দেবে না। তিনি জানান, এই অভিযান এখনো চলছে এবং প্রয়োজন হলে তা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে বার্তা দেন, বর্তমান নেতৃত্বকে সরিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। তাঁর এই মন্তব্য অনেকের কাছে সরাসরি শাসন পরিবর্তনের আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রাণহানির আশঙ্কা ও প্রতিশোধের হুমকি
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, যুদ্ধে প্রাণহানি অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, সাহসী মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, হতাহতের ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের সুরক্ষায় সব ধরনের সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ইরান ইতোমধ্যে পাল্টা পদক্ষেপ শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা বেড়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কূটনীতির ব্যর্থতা না কি পূর্বপরিকল্পিত আঘাত
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক পথে সমাধানের চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। মার্কিন দূতেরা ইরানের সঙ্গে একাধিক দফা পরোক্ষ আলোচনা চালান। লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসতে বাধ্য করা। কিন্তু সেই আলোচনা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়নি। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। এই অবস্থান নিয়েই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
হামলার লক্ষ্য কী
ট্রাম্পের বক্তব্যে সময়ের সঙ্গে লক্ষ্য বদলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। কখনো তিনি ইরানি বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষার কথা বলেছেন, কখনো পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানোর কথা, আবার কখনো সরাসরি শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনকেও তিনি বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে সামরিক হামলা এসব লক্ষ্য কতটা পূরণ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিমান হামলা দিয়ে এক দেশের নেতৃত্বকে সরানো ইতিহাসে খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। ফলে পরবর্তী পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ চাপ
বিদেশে যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই প্রেক্ষাপটে ইরানে বড় সামরিক অভিযান শুরু করা তাঁর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে একাধিক দেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। এতে তাঁর সমর্থক গোষ্ঠীর ভেতরেও প্রশ্ন উঠছে।
উপপ্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অভিযান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নেবে না। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্কভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতার সূচনা
মার্কিন হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা এখন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। সংঘাত কত দিন চলবে, কত প্রাণহানি ঘটবে কিংবা শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে কি না—সবই এখন প্রশ্নের মুখে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে নজর এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সামরিক অভিযানের ফলাফল শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















