প্যারিসে থাকলে তিনি আর শুধু বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী নন, তিনি আরেকজন মানুষ। ফ্রান্সের রাস্তায়, মেট্রোতে কিংবা ক্যাফেতে জোডি ফস্টার নিজের মতো করে বাঁচতে পারেন। সেখানেই তাঁর জীবনের অন্য এক রূপ, যেখানে খ্যাতি নয়, গোপনীয়তাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
প্যারিসে জন্মদিন, শরীরের যন্ত্রণা আর কাজের দায়িত্ব
তেষট্টিতম জন্মদিনে প্যারিসে ছিলেন জোডি ফস্টার। তখন তাঁর শরীর জুড়ে যন্ত্রণা। মেরুদণ্ডের ডিস্ক ভেঙে পড়েছে, অস্ত্রোপচার দরকার, সামনে হিপ প্রতিস্থাপনও। তবু কালো ধূসর পোশাকে, সাজগোজে প্রস্তুত হয়ে তিনি দিনভর সাক্ষাৎকারে হাজির। নতুন ফরাসি ছবি ব্যক্তিগত জীবন প্রচার করতেই এই ব্যস্ততা। সামান্য ব্যথানাশক খেয়েই তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। বৃষ্টিতে ভিজেও হাসিমুখে ছবি তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, কাজ মানেই নিজের ওপর জয়।

ফরাসি ভাষায় প্রথম একক প্রধান চরিত্র
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে বহু ছবিতে কাজ করলেও ফরাসি ভাষায় একক প্রধান চরিত্রে এই প্রথম জোডি ফস্টার। ব্যক্তিগত জীবন ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন লিলিয়ান স্টাইনার চরিত্রে, যিনি প্যারিসে থাকা এক মার্কিন মনোবিশ্লেষক। রোগীর রহস্যময় মৃত্যুর পর তাঁর সাজানো জীবন ভেঙে পড়ে, শুরু হয় এক ব্যক্তিগত অনুসন্ধান। ফরাসি ভাষায় তাঁর সাবলীল উচ্চারণ, প্রায় নিখুঁত টান ছবির বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রশংসা পেয়েছিল। তবে ফ্রান্সে মুক্তির পর সমালোচনা ছিল মিশ্র। গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অভিনয়ের প্রশংসায় ছিলেন সবাই। বিশেষ করে জোডি ফস্টার ও দানিয়েল ওতোইয়ের রসায়ন দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে।

শৈশব থেকেই ফ্রান্সের সঙ্গে আত্মিক যোগ
ফ্রান্সের প্রতি টান শুরু হয়েছিল শৈশবেই। ফ্রান্সপ্রেমী মায়ের হাত ধরে আট বছর বয়সে প্রথম প্যারিসে আসা। তখনই ব্যাগেট, আইফেল টাওয়ার আর সেইনের স্মৃতি তাঁর মনে গেঁথে যায়। পরে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফরাসি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, সব বিষয় ফরাসি ভাষায় শেখা। সেখানেই ভাষার ওপর পূর্ণ দখল তৈরি হয়।
প্যারিসে হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা
এই ছবির প্রস্তুতির সময় জোডি ফস্টার পুরোপুরি ফরাসি জীবনে ডুবে যান। বইয়ের দোকানে ঘোরা, বাসে মেট্রোতে যাতায়াত, ছোট খাবারের দোকানে খাওয়া, জিমে যাওয়া, এমনকি সেলো শেখাও। তিন সপ্তাহ কোনো মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে কথাই বলেননি। দিনের শেষে এত ফরাসি বলতে বলতে চোয়াল নাড়ানো কঠিন হয়ে যেত।

খ্যাতির আড়ালে গোপনীয়তার স্বাদ
ফ্রান্সে তাঁকে কেউ বিরক্ত করে না। রাস্তায় কেউ তাকায় না, প্রশ্ন করে না। এই নিঃশব্দ সম্মানই তাঁর কাছে অমূল্য। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে মানুষ লিফটেই নিজের জীবনের গল্প বলে ফেলে, সেখানে ফরাসি নির্লিপ্ততা তাঁকে স্বস্তি দেয়। এখানেই তিনি সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারেন।
সহশিল্পীদের চোখে জোডি ফস্টার
সহশিল্পীরা তাঁকে দেখেন নিখুঁত পেশাদার হিসেবে। ফরাসি অভিনেতারা প্রায় ভুলেই যান তিনি ফরাসি নন। দানিয়েল ওতোইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পর্দার বাইরেও গভীর। শেষ দৃশ্যে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় সেই বিশ্বাসেরই ফল।

ভাষার ভেতর নতুন মানুষ
জোডি ফস্টারের বিশ্বাস, ভাষা বদলালে মানুষও বদলে যায়। ফরাসি ভাষায় তিনি নিজেকে ভিন্নভাবে প্রকাশ করতে পারেন। ভবিষ্যতে ফরাসি ভাষায় পরিচালনাও করতে চান। তাঁর কথায়, এত বছরের কাজের পর আর প্রমাণ করার কিছু নেই, এখন কেবল নিজের মতো করে কাজ করাই আসল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















