১৯৭০-এর দশক ছিল বিপ্লবী সহিংসতার এক ভীতিকর সময়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ছিল ঢিলেঢালা, আর টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার গোটা পৃথিবীকে সন্ত্রাসীদের মঞ্চে পরিণত করেছিল। সেই দশকের রাজনৈতিক সহিংসতা, বিমান ছিনতাই ও জিম্মি নাটকই পরবর্তী কয়েক দশকের সন্ত্রাসবাদের ভিত্তি গড়ে দেয়।
বিমান ছিনতাইয়ের সেই সেপ্টেম্বর
১৯৭০ সালের ৬ থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিলিস্তিনের পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন বা পিএফএলপি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে পাঁচটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই বা ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালায়। একটি অপারেশন ব্যর্থ হয়, আরেকটি কায়রোর রানওয়েতে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়। তবে তিনটি বিমান, যেগুলোতে বেসামরিক যাত্রী ছিল, সেগুলোকে জর্ডানের মরুভূমির এক দূরবর্তী এয়ারস্ট্রিপে নামতে বাধ্য করা হয়। এই নাটকীয় সন্ত্রাসী অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী ওয়াদি হাদ্দাদ ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। পিএফএলপির আরও অনেক সদস্যও খ্রিষ্টান ছিলেন।
ধর্ম নয়, আদর্শই ছিল চালিকাশক্তি
এই সংগঠনের সহিংসতার পেছনে ধর্মীয় কোনো প্রেরণা ছিল না। তাদের বিশ্বাসের মূলে ছিল চরম ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ—মার্কসবাদ, উপনিবেশবিরোধিতা ও আরব জাতীয়তাবাদ। ফিলিস্তিনকে তারা দেখত বৈশ্বিক বিপ্লবের সূচনাবিন্দু হিসেবে। ১৯৭০-এর দশকজুড়ে এই বামপন্থী মতাদর্শ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিম ইউরোপ তখন এই সহিংসতার মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছিল।
বামপন্থা থেকে ইসলামি সন্ত্রাসে রূপান্তর
এই সহিংসতার ঢেউয়ের মধ্যে ছিল ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদদের হত্যা করার মতো রক্তাক্ত ঘটনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারার জায়গা নেয় ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদ। লেবাননে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া, পরে ওসামা বিন লাদেন এবং আরও পরে ইসলামিক স্টেট—এই ধারাবাহিকতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়।
জেসন বার্কের বিশ্লেষণ
দ্য রেভল্যুশনিস্টস গ্রন্থে লেখক জেসন বার্ক পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যান সেই সময়টিতে, যখন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দুর্বল ছিল এবং সরাসরি সম্প্রচার সন্ত্রাসকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরত। আগের অনেক বিশ্লেষকের মতো তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ও ইসলামপন্থী সন্ত্রাসকে আলাদা করে দেখেননি। বরং তিনি দেখাতে চেয়েছেন, প্রথম ধারার ব্যর্থতাই কীভাবে দ্বিতীয় ধারার জন্ম দিয়েছে। তার মতে, দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে তরুণদের একাংশ রাজনৈতিক মুক্তির খোঁজে সর্বগ্রাসী মতাদর্শ ও নাটকীয় সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

পিএফএলপির সহিংসতার পরিণতি
১৯৭০ সালের সেই বহু বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হয়। জর্ডানের রাজা হুসেইন তখন তার দেশের ভেতরে রাষ্ট্রের মতো গড়ে ওঠা ফিলিস্তিনি গেরিলা গোষ্ঠীগুলোকে উচ্ছেদ করতে সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে জিম্মিরা কেউ জর্ডানীয় সেনাদের হাতে মুক্তি পায়, কেউ পিএফএলপির কাছ থেকে ছাড়া পায়। তবে এই সহিংসতা ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক জনমতকে নেতিবাচক করে তোলে। কয়েকজন বন্দি মুক্তির বিনিময়ে এই মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া।
জার্মান বামপন্থী ও ফিলিস্তিনি জোট
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশগুলোর একটি হলো পশ্চিম জার্মানির বামপন্থী গোষ্ঠী রেড আর্মি ফ্যাকশনসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর জোটের বর্ণনা। নাৎসি শাসনের মাত্র পঁচিশ বছর পরই এই জার্মান উগ্রপন্থীরা ইহুদি রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করতে শুরু করে।
এনটেব্বে বিমান ছিনতাই
১৯৭৬ সালের ২৭ জুন জার্মানির রেভল্যুশনারি সেলসের দুই সদস্য পিএফএলপির সঙ্গে মিলে একটি এয়ার ফ্রান্স বিমান ছিনতাই করে উগান্ডার এনটেব্বে বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। সেখানে জার্মান সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ইসরায়েলি জিম্মিদের পাহারা দেয়, যাদের মধ্যে হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফেরা মানুষও ছিলেন। পরে ইসরায়েলি কমান্ডো অভিযানে অধিকাংশ জিম্মি মুক্তি পায় এবং ছিনতাইকারীরা নিহত হয়।
কার্লোস দ্য জ্যাকাল
লেখক যদিও সন্ত্রাসী শব্দটি ব্যবহার এড়িয়ে চলেন, তবে কার্লোস দ্য জ্যাকাল নামে পরিচিত ইলিচ রামিরেজ সানচেজের ক্ষেত্রে সেই অভিধা এড়ানো কঠিন। পিএফএলপি, লিবিয়ার শাসক গাদ্দাফি ও অন্যান্য শক্তির হয়ে বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালানো এই ব্যক্তি নিজেকে নিপীড়িতদের প্রতিনিধি বলে দাবি করতেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ফ্রান্সে একাধিক হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন সাজা পান।
ত্রুটি সত্ত্বেও প্রাসঙ্গিক বার্তা
বইটিতে কিছু তথ্যগত ভুল থাকলেও তা মূল বক্তব্যকে দুর্বল করে না। বরং পাঠকের মনে এক ধরনের পুনরাবৃত্তির অনুভূতি জাগায়। ১৯৬৯ সালে একটি বিমান ছিনতাইয়ের সময় পিএফএলপি বলেছিল, তারা বিশ্বকে ইসরায়েলের অপরাধ জানাতে চায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর হামাস নেতার বক্তব্যেও শোনা যায় প্রায় একই ভাষা। দ্য রেভল্যুশনিস্টস মনে করিয়ে দেয়, এই চক্রের শুরু কোথায়। এর শেষ কোথায়, তা এখনো অজানা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















