গাজায় যুদ্ধবিরতির তিন মাস পার হলেও স্থায়ী শান্তির কোনো স্পষ্ট পথ এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ গাজার শান্তি থেকে সরে গিয়ে ক্রমেই বড় বড় আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছে। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকায় মানুষের দুর্ভোগ কমার বদলে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
গাজায় নতুন প্রশাসন, কিন্তু ক্ষমতা অনিশ্চিত
জানুয়ারির মাঝামাঝি গাজা প্রশাসনের জন্য একটি নতুন কাঠামো ঘোষণা করা হয়, যার নাম গাজার প্রশাসন পরিচালনায় জাতীয় কমিটি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কমিটির এক নেতা বলেন, সামনের দিনগুলোতে মানুষের মুখে হাসি ফেরানো আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই কমিটি এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ইসরায়েল এখনো তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। ফলে প্রথম বৈঠক করতে হয়েছে কায়রোতে। এই কমিটি হামাস কিংবা পশ্চিম তীর ভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় বলে দাবি করা হলেও, কবে তারা বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব নেবে, তা স্পষ্ট নয়।
ফিলিস্তিনি ছাড়া শান্তির বোর্ড
এই কমিটির ওপর আবার একাধিক স্তরের আন্তর্জাতিক বোর্ড বসানো হয়েছে। একদিকে রয়েছে গাজা নির্বাহী বোর্ড, যেখানে তুরস্ক, কাতার ও মিশরের শীর্ষ কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রয়েছেন। তার ওপরে রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ড, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও যুক্ত হয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুটি কাঠামোর কোনোটিতেই একজন ফিলিস্তিনির স্থান নেই।

এরও ওপরে রয়েছে তথাকথিত শান্তি বোর্ড, যার সভাপতিত্ব করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে। এই বোর্ডে বিভিন্ন দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। স্থায়ী সদস্য হতে হলে বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে হবে। কিন্তু এই বোর্ডের ঘোষণাপত্রে গাজার নাম পর্যন্ত নেই। বরং এটি নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার বিকল্প মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরছে।
দ্বিতীয় ধাপের শান্তি পরিকল্পনা থমকে
ট্রাম্পের ঘোষিত বিশ দফা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে যে বড় পদক্ষেপগুলোর কথা বলা হয়েছিল, তার কোনোটি বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন হয়নি, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ শুরু হয়নি, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও দৃশ্যমান নয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজার পুনর্গঠনের কাজ ও কার্যত বন্ধ।
এর বদলে ইসরায়েল গাজার বড় একটি অংশে সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। তথাকথিত হলুদ অঞ্চল সম্প্রসারণ করে প্রায় অর্ধেকের বেশি এলাকা সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্থায়ী সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে, এমনকি পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন বসানো হচ্ছে। সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সেখানে দীর্ঘদিন থাকতে প্রস্তুত।
মানবিক সংকট আরও গভীর
গাজার বাকি অংশে শীতের মধ্যে লাখো মানুষ তাঁবু কিংবা আধাভাঙা ভবনে দিন কাটাচ্ছে। হামাস সেখানে আবার ও শক্তি বাড়াচ্ছে এবং বিরোধীদের দমন করছে। প্রায় সব কৃষিজমি এখন সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পড়ে যাওয়ায় খাদ্য ও ওষুধের জন্য মানুষকে সীমিত ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী কবে ঢুকবে, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত নেই।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, হামাস নিরস্ত্র না হলে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। যুদ্ধে ইতিমধ্যে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর বিমান হামলা ও সংঘর্ষে মৃত্যু থামেনি। আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে পূর্ণমাত্রার নতুন যুদ্ধ থেকে বিরত রাখছে। তবে ট্রাম্পের নানা বোর্ড ও উদ্যোগ এই পরিস্থিতিতে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















