বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে ভারত। শনিবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সফল ভবিষ্যৎ কামনা করে এই বার্তা দেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতায় ভারতের অবস্থান
অনুষ্ঠানে প্রণয় ভার্মা বলেন, ভারত সব সময় একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য দুই দেশকে আরও দূরদর্শী ও ভবিষ্যৎপ্রস্তুত সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করছে।
ঢাকায় আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জ্বালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাউজুল কবির খান। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, ঢাকায় কর্মরত কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।

দুই দেশের সম্ভাবনা ও যৌথ উন্নয়ন
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত বর্তমানে দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি। তরুণ, দক্ষ ও উদ্ভাবনী জনগোষ্ঠীর শক্তিতে ভর করে দুই দেশ একে অপরের টেকসই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক সংহতির ভিত্তি গড়তেও দুই দেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, যৌথভাবে আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল, অভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি করিডোর গড়ে তোলা সম্ভব, যা উভয় দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের জ্বালানি ভবিষ্যৎ যেন পরিষ্কার, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হয়, সে লক্ষ্যেও একসঙ্গে কাজ করা যেতে পারে।
পরিবেশ ও জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
প্রণয় ভার্মা বলেন, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। ভৌগোলিক নৈকট্যকে নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তর করে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এই অংশীদারত্ব সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি বিশ্বাসভিত্তিক, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর এবং পারস্পরিক স্বার্থ, লাভ ও সংবেদনশীলতায় লালিত একটি সম্পর্ক।
ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের জনগণ নিজেদের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করে দেশকে একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সমতা ও মানবিক মর্যাদার আদর্শে তারা নিজেদের অঙ্গীকারবদ্ধ করে।
এরপরের ৭৬ বছরে ভারত দারিদ্র্যপীড়িত দেশ থেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আজ ভারত একটি আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক অগ্রগতিতে অবদান রাখছে এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাধান দিচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক বন্ধন
প্রণয় ভার্মা বলেন, এই যাত্রাপথে বাংলাদেশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যৌথ ত্যাগের স্মৃতি দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
তিনি জানান, সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পের প্রতি অভিন্ন ভালোবাসা ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম দুই দেশের সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে একসূত্রে বেঁধেছে। নৃত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যেও রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক মিল।

সংযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতা দুই দেশের মানুষ, সমাজ ও ব্যবসাকে আরও কাছাকাছি এনেছে।
ভারতের একটি শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে উচ্চগতির ডিজেল পরিবহনের পাইপলাইন, সীমান্ত পেরিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন যার মাধ্যমে ভারত ও নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আসছে—এসব উদ্যোগ জ্বালানি সংযোগের ভিত্তি তৈরি করেছে এবং প্রকৃত অর্থে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, দুই দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পকে শক্তি জোগাচ্ছে, যা পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতার সুফল প্রমাণ করে। এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে এই অংশীদারত্ব উভয় দেশের জনগণ ও ব্যবসার জন্য লাভ বয়ে এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















