দেশজুড়ে টানা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির সরবরাহ সংকট চলছে। দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাজারে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যেই নতুন করে যোগ হয়েছে পাইপলাইনের গ্যাস সংকট। বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাস না পেয়ে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ছুটছেন। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে না কোথাও।
খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, রোববার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এলপিজির বাজার স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নগর জীবনে রান্নার সংকট
শহরাঞ্চলের মানুষ রান্নার জন্য মূলত দুটি উৎসের ওপর নির্ভর করেন—পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস এবং এলপিজি সিলিন্ডার। এই দুই উৎসেই সংকট দেখা দেওয়ায় রান্নার ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। কেউ কেউ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনছেন। এতে বাজারে এসব চুলার দামও বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই নিজেদের দুর্ভোগের কথা জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দারা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে কয়েক সপ্তাহ ধরেই গ্যাস সংকটের কথা তুলে ধরছেন। স্থানীয় বাসিন্দা রবিন হাসান জানান, মাসে এক হাজার আশি টাকা গ্যাস বিল দেওয়ার পরও তাকে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। তার ভাষায়, এই কষ্ট দেখার কেউ নেই।

অন্য গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা
এলাকার গৃহিণী শায়লা শারমীন জানান, তিনি বারো কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন দুই হাজার টাকায়। শারমীন আক্তার বলেন, একই ওজনের সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে দুই হাজার দুইশ টাকা। আর শামীমা সুলতানার দাবি, তিনি কিনেছেন দুই হাজার পাঁচশ পঞ্চাশ টাকায়। দাম নির্ধারণে এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এলপিজি আমদানি ও চাহিদার চাপ
দেশে এলপিজি ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা এক কোটির বেশি। জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র রমজান সামনে রেখে সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এলপিজি আমদানি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। বারোটি এলপিজি কোম্পানি অতিরিক্ত আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশে মাসিক গড় চাহিদা প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ থেকে এক লাখ ষাট হাজার টন। জানুয়ারিতে এক লাখ সাতষট্টি হাজার ছয়শ টন এবং ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ চুরাশি হাজার একশ টন এলপিজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মোট ব্যবহারের প্রায় আশি শতাংশই রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়।
তবু জানুয়ারির শেষ ভাগেও বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানীর শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা রওনক জাহান জানান, মাসের শুরুতেই তার এলপিজি শেষ হয়ে গেছে। এখন বিদ্যুৎচালিত চুলায় রান্না করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ। কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আর পেলেও দাম চাইছে দুই হাজার দুইশ টাকা।
মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সুরাইয়া সেঁজুতি বলেন, দুপুরে রান্নার সময় হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যায়। আশপাশের দোকানে না পেয়ে রিকশায় করে অন্য এলাকায় গিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে দুই হাজার দুইশ পঞ্চাশ টাকায়। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার তিনশ ছয় টাকা।
সংকটের কারণ কী
এলপিজি আমদানিকারকদের ভাষ্য, শীতকালে এলপিজির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে এলপিজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে চাইলেও পর্যাপ্ত এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজ সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। আমদানি বাড়াতে পারলে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
পাইপলাইনের গ্যাস পরিস্থিতি
ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস। প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাতাশ লাখ আটাত্তর হাজার, যার মধ্যে আবাসিক গ্রাহক সাতাশ লাখ আটান্ন হাজার।
তিতাসের তথ্যমতে, দৈনিক চাহিদা প্রায় একশ আশি কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে একশ পঞ্চান্ন থেকে একশ ষাট কোটি ঘনফুট। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও কমে একশ পঁয়তাল্লিশ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে ঢাকার বহু এলাকায় চুলায় গ্যাস মিলছে না।

পেট্রোবাংলা জানায়, দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় তিনশ আশি কোটি ঘনফুট। সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় দুইশ ষাট কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসছিল প্রায় পঁচাশি কোটি ঘনফুট। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে এই গ্যাস সরবরাহ করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের কারণে একটি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় সরবরাহ নেমে আসে আটান্ন কোটি ঘনফুটে। পরে সন্ধ্যার দিকে আবার সরবরাহ শুরু হলেও স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলবে। এ সময় এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কম থাকবে। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম অনুভূত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















