মানসিক চাপ শুধু মাথার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে শরীরে ও তার প্রভাব পড়ে। পেট মোচড়ানো, বুক ধড়ফড় করা কিংবা ত্বকে হঠাৎ ব্রণ—সবই চাপের ইঙ্গিত। চিকিৎসকেরা বলছেন, নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে পিসিওএস সমস্যায়। সন্তান ধারণের বয়সী বহু নারী যে হরমোন জনিত ও বিপাক গত সমস্যায় ভোগেন, তার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।
পিসিওএস কেবল ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মস্তিষ্ক, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি, হরমোনের ভারসাম্য এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া। ফলে মানসিক চাপ বাড়লেই শরীরের ভেতরে একের পর এক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
চাপের হরমোন আর হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
চাপের মুহূর্তে শরীরে সক্রিয় হয় এক বিশেষ হরমোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যার ফলে বাড়ে কর্টিসল নামের চাপের হরমোন। চিকিৎসকদের মতে, পিসিওএসে ভোগা অনেক নারীর অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি আগে থেকেই অতিসক্রিয় থাকে। সেখানে কর্টিসল বেড়ে গেলে ব্রণ, চুল পড়া এবং অনিয়মিত মাসিক আরও বেড়ে যায়।

দুবাইয়ের এক বিশেষজ্ঞ স্ত্রীরোগ চিকিৎসক জানান, কর্টিসল রক্তে শর্করা বাড়ায় এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। যেহেতু পিসিওএস এর মূল সমস্যা ইনসুলিন প্রতিরোধ, তাই কর্টিসল বেড়ে গেলে শরীরে ইনসুলিন ও বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ডিম্বাশয়ে, যেখানে অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন তৈরি হয়। এর ফলে ডিম্বস্ফোটন বাধাগ্রস্ত হয় এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা স্থায়ী আকার নেয়।
ডিম্বস্ফোটনে ব্যাঘাত আর প্রোজেস্টেরনের ঘাটতি
চাপ শুধু মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে না, মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের কাজও ব্যাহত করে। চাপের কারণে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত সংকেত বদলে যায়। এতে এক ধরনের হরমোন বেড়ে যায়, অন্যটির তুলনায় কমে যায়, যা ডিম্বস্ফোটনের বদলে পুরুষ হরমোন তৈরি কে উৎসাহিত করে।
ডিম্বস্ফোটন কম হলে প্রোজেস্টেরন নামের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন ও কমে যায়। এই হরমোন মাসিক নিয়মিত রাখার পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতেও সাহায্য করে। দীর্ঘদিনের চাপ শরীরে হালকা মাত্রার প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা পিসিওএস কে আরও খারাপ করে তোলে। চিকিৎসকদের মতে, এই প্রদাহ ইনসুলিন প্রতিরোধ বাড়ায়, ডিম্বাণুর গঠন ব্যাহত করে এবং ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নষ্ট করে।
ঘুমের অভাবেও বাড়ে ঝুঁকি

অপর্যাপ্ত ঘুম চাপের প্রভাবআরও বাড়িয়ে দেয়। রাতে কর্টিসল বেড়ে যায় এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমে। অনেক পিসিওএস রোগীর শরীরে কর্টিসলের স্বাভাবিক ছন্দই বিঘ্নিত থাকে, ফলে তারা চাপজনিত হরমোন সমস্যায় আরও বেশি আক্রান্ত হন।
একটি নিজেকে বাড়িয়ে নেওয়া চক্র
চাপ পিসিওএসের মূল চালিকাশক্তিগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে। ইনসুলিন প্রতিরোধ, অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন, প্রদাহ এবং ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা মিলিয়ে তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র। চিকিৎসকেরা বলছেন, তাই পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে শুধু ডিম্বাশয়ের লক্ষণ দেখলে চলবে না, চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পিসিওএসে আক্রান্ত নারীরা একই শারীরিক গঠনের সুস্থ নারীদের তুলনায় চাপের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। চাপের পরীক্ষায় তাদের শরীরে কর্টিসল ও অন্যান্য চাপের হরমোন দ্রুত বেড়ে যায় এবং হৃদস্পন্দন ও বেশি বাড়ে। সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, হতাশা এবং চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম, যা সরাসরি পুরুষ হরমোন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
কর্টিসলই মূল সংযোগ

চাকরির চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব আর দৈনন্দিন দৌড়ঝাঁপ ধীরে ধীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এক পারিবারিক চিকিৎসক জানান, কর্টিসল বেড়ে গেলে ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হয় এবং প্রোজেস্টেরন কমে যায়। এতে মাসিক চক্র আরও অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা চললেও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে ওঠে।
উপসর্গ কেন আরও বাড়ে
দীর্ঘদিনের চাপ মাসিক অনিয়মিত বা বন্ধ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে পুরুষ হরমোন বেড়ে যাওয়ায় ব্রণ, অবাঞ্ছিত লোম এবং মাথার চুল পাতলা হওয়ার সমস্যা বাড়ে। চাপজনিত অতিরিক্ত খাওয়া, মিষ্টির প্রতি ঝোঁক ও ওজন বাড়ার প্রবণতা ইনসুলিন প্রতিরোধকে আরও জটিল করে তোলে।
চাপ নিয়ন্ত্রণেই সমাধানের শুরু

চিকিৎসকদের মতে, পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে চাপ কমানো অত্যন্ত জরুরি। বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণ, কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং নিয়মিত ঘুম ও খাবারের রুটিন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। অল্প সময় হাঁটা, শ্বাসের ব্যায়াম কিংবা পর্দামুক্ত বিরতি কর্টিসল কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পরিবারে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়াও পরিস্থিতি সহজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, পিসিওএস কেবল হরমোনের সমস্যা নয়। এর গভীরে থাকা চাপ ও মানসিক অস্থিরতাকে বোঝা এবং নিয়ন্ত্রণ করাই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















