বিশ্বের প্রযুক্তি মানচিত্রে পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভাবনের কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সেই পরিচিত চিত্র ভাঙতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন আর অন্যদের তৈরি প্রযুক্তির কেবল ব্যবহারকারী থাকতে চায় না। বরং তারা নিজেরাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দিতে চাইছে। এই বদলের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়ে ও গভীর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্বের পথে মধ্যপ্রাচ্য
দশকের পর দশক ধরে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নির্ভর করেছে মূলত পুঁজি, দক্ষ জনবল ও কম্পিউটিং সক্ষমতার ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে দুই হাজার পঁচিশ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাড়িয়ে বাস্তব বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে অঞ্চলটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে। উন্নত তথ্য কেন্দ্র, উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যকে অন্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে দিচ্ছে।
পুঁজি ও অবকাঠামোর শক্ত ভিত
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এই পরিবর্তনের বড় চালিকাশক্তি। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা বাজার চাপের বাইরে থেকে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারছে। ফলে উন্নত তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, মৌলিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল এবং তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস বলছে, যারা শুরুতেই এই ভিত্তি গড়ে তোলে, তারাই দীর্ঘদিন নেতৃত্ব ধরে রাখে। মধ্যপ্রাচ্য এখন সেই সুযোগের দ্বারপ্রান্তে।
নিয়ন্ত্রণ ও নীতিতে গতি
শুধু অবকাঠামো নয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের শাসন ব্যবস্থা বারবার দেখিয়েছে, তারা প্রয়োজনে দ্রুত নীতি বদলাতে পারে। কর্মসপ্তাহের কাঠামো পরিবর্তন কিংবা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিয়ম সংস্কার তার উদাহরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা বৈশ্বিক সংস্থা গুলোর কাছে অঞ্চলটিকে আকর্ষণীয় করে তুলছে।

বিশ্ব সহযোগিতায় শক্তি বৃদ্ধি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়টি বুঝেই বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও শিল্পখাতকে একত্রিত করছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে তথ্য কেন্দ্র স্থাপন করছে, গবেষণায় অংশ নিচ্ছে এবং স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে সমাধান তৈরি করছে। এতে একদিকে বৈশ্বিক সংযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ও বজায় থাকছে।
মানবসম্পদই আসল শক্তি
সব প্রযুক্তির কেন্দ্রে মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ জনগোষ্ঠী, উচ্চ প্রযুক্তি গ্রহণের মানসিকতা এবং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত শিক্ষা, কর্মজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত মানবসম্পদ গড়ে তুলছে।

ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতৃত্ব হঠাৎ ঘোষণা করা যায় না, এটি সময়ের সঙ্গে অর্জন করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষত্ব হলো অবকাঠামো, নীতি, পুঁজি ও মানবসম্পদের একসঙ্গে সমন্বয়। খুব কম অঞ্চলই এত সুসংগঠিত ভাবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে। এখন প্রশ্ন আর সক্ষমতা নিয়ে নয়, বরং তারা কতটা সাহসী ভাবে ভবিষ্যৎকে গড়তে চায়। ইঙ্গিত স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের পক্ষে সময় ঘুরছে এবং বিশ্ব তা লক্ষ্য করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















