ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ দেশটির শাসন ব্যবস্থার ভেতরের গভীর টানাপোড়েন ও দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে হাজারো মানুষের মৃত্যু শুধু কঠোর দমননীতির ই ইঙ্গিত নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে বাড়তে থাকা ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

যুদ্ধের ধাক্কা ও নেতৃত্বের শূন্যতা
গত বছরের জুনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তেহরানে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধাক্কা লাগে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের কমান্ডাররা হঠাৎ করেই ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা ও নতুন করে সামরিক হামলার হুমকির মুখে এই নতুন নেতৃত্ব কোন পথে দেশকে এগিয়ে নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
বিক্ষোভে রক্তক্ষয়ী প্রতিক্রিয়া
ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা কম দেখানো হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা অস্বীকারের উপায় নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্রুত ও নৃশংস প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে শাসকগোষ্ঠী বিক্ষোভকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে।

সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বের প্রশ্ন
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কর্তৃত্ব এখন প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে। তাঁর বয়স, দীর্ঘদিনের অনমনীয় নীতি ও দেশের ভেতরের পরিবর্তনের দাবিকে উপেক্ষা করা ক্রমেই শাসনব্যবস্থাকে কোণঠাসা করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ই শাসন ব্যবস্থার মূল ভর কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ
বিদেশি হামলার পর প্রথম দিকে জাতীয়তাবাদী আবেগে মানুষ একত্রিত হলেও নতুন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দ্রুত ভেঙে পড়ে অর্থনীতি। মুদ্রার মূল্য ধস নামায়, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে এবং ঐতিহাসিক বাজার এলাকাগুলো থেকেই বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পানীয় জল ও বিদ্যুতের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিপ্লবী গার্ডের ভেতরের বিভাজন
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভেতরে ও প্রজন্মগত বিভাজন স্পষ্ট। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বেড়ে ওঠা পুরোনো নেতৃত্ব ও সাম্প্রতিক বছরগুলোর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সময় উঠে আসা তরুণ কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষতির পর তরুণ অংশটি আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
বিশ্লেষকেরা ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাবনার কথা বলছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, দেশটি সামরিক প্রভাবিত শাসনে রূপ নিতে পারে, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরো তীব্র হবে। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের আবহে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, বর্তমান চাপ শিগগিরই কমছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















