লাস ভেগাসে ইউএফসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা থেম্বা গোরিম্বোর শরীরজুড়ে শুধু শক্ত পেশির গল্প নয়, লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। জিম্বাবুয়ের মারাঞ্জে হীরার খনিতে পুলিশ আর সেনাবাহিনীর ধাওয়া খাওয়া সেই কিশোর আজ বিশ্বমানের মিশ্র মার্শাল আর্ট যোদ্ধা। পরাজয়ের পর আবার নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার দৃশ্য তিনি শেয়ার করছেন সামাজিক মাধ্যমে, আর তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় হয়ে উঠছে লড়াই আর পুনর্জন্মের সাক্ষ্য।
শৈশবের ক্ষত আর হীরার খনির ভয়
থেম্বা গোরিম্বোর জীবনের শুরুটা ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। নয় বছর বয়সে মাকে হারানো, তেরো বছরে বাবার মৃত্যু তাকে খুব দ্রুত বড় করে তোলে। আত্মীয়স্বজনের দয়ার ওপর নির্ভর করে চলছিল জীবন, কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক সংকট আর খরায় সেই ভরসাও ভেঙে পড়ে। খাবারের তীব্র অভাব তাকে টেনে নিয়ে যায় মারাঞ্জে হীরার খনিতে। সেখানে হীরা পাচার, পুলিশের মার, কুকুরের কামড় আর মৃত্যুভয়ের মধ্যেই কেটেছে তার কৈশোর।
দুই হাজার আট সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর অভিযান তার মনে গভীর দাগ কাটে। হেলিকপ্টার, গুলি আর লাগাতার ধাওয়ার সেই দিনগুলোতে শত শত মানুষ মারা যায় বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি। গোরিম্বোর শরীরের ক্ষতচিহ্ন আজও সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। তবুও বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি আবার ফিরে গিয়েছিলেন খনিতে, ক্ষত শুকানোর আগেই।

দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা
সেনা অভিযানের কয়েক মাস পর তিনি জিম্বাবুয়ে ছেড়ে পাড়ি জমান দক্ষিণ আফ্রিকায়। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করছিল নতুন বিপদ। প্রথম দিনই আটক হয়ে ফেরত পাঠানো, আবার সীমান্ত পেরিয়ে ঢোকার সময় প্রাণ হারানোর মুখোমুখি হওয়া, নদী পার হওয়ার ভয়াবহ স্মৃতি সবই তার জীবনের অংশ। দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি ছিলেন গৃহহীন, কখনো গির্জায় রাত কাটিয়েছেন। দিনে মজুরের কাজ, বাগানের শ্রমিক হিসেবে সামান্য আয়ে নিজের পেট চালানো আর পরিবারের জন্য কিছু পাঠানো ছিল নিত্যদিনের সংগ্রাম।
লড়াইয়ের প্রতি প্রেম আর ক্যারিয়ারের শুরু
একটি মার্শাল আর্টের সিনেমা বদলে দেয় তার জীবনের দিক। লড়াইয়ের প্রতি জন্ম নেওয়া ভালোবাসা তাকে টেনে আনে জিমে। নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করে, দীর্ঘ সময়ের শিফট সামলে জমানো টাকায় প্রশিক্ষণ নিতেন তিনি। মানসিক দৃঢ়তাকেই তিনি নিজের আসল শক্তি মনে করেন। সেই জেদই তাকে দুই হাজার দশ সালে শৌখিন যোদ্ধা থেকে ধীরে ধীরে পেশাদার মঞ্চে নিয়ে আসে।

ইউএফসির মঞ্চে ইতিহাস
দুই হাজার বাইশ সালের শেষ দিকে অল্প সম্বল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান থেম্বা গোরিম্বো। মায়ামির একটি জিমে সোফায় রাত কাটানো সেই মানুষটাই কয়েক মাসের মধ্যে ইউএফসি র অক্টাগন পা রাখেন। প্রথম লড়াইয়ে হারলেও পরের ম্যাচে জয় এনে দেন জিম্বাবুয়েকে যুক্তরাষ্ট্রে ইউএফসির প্রথম জয়। জয়ের পর ব্যাংক হিসাবে হাতে গোনা কয়েক ডলার দেখিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া তার পোস্ট ছুঁয়ে যায় লাখো মানুষকে। সেই পোস্ট থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এক বিখ্যাত কুস্তিগীর ও অভিনেতা তাকে মায়ামিতে একটি বাড়ি কিনে দেন।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন
আজ পর্যন্ত ইউএফসি তে তার জয় চারটি, হার তিনটি। কিন্তু সংখ্যার হিসাবের চেয়েও বড় তার বিশ্বাস। তিনি মনে করেন, তার জীবন যেন ঈশ্বর লিখে রাখা এক সিনেমা, যেখানে তিনি প্রধান চরিত্র। প্রার্থনা, কঠোর পরিশ্রম, ইতিবাচক মনোভাব আর পরিবারের কথা মনে রেখে এগিয়ে যেতে চান তিনি। লক্ষ্য একটাই, একদিন ইউএফসি চ্যাম্পিয়ন হওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















