দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেনের প্রধান ভরকেন্দ্র ছিল এই মুদ্রা। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণপত্র, বিশেষ করে ট্রেজারি বন্ড, নোট ও বিল—সব সময়ই বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গভীর বাজার, উচ্চ তারল্য ও স্থিতিশীলতার কারণে এই আস্থা দীর্ঘদিন অটুট ছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরাচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ডলারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ডলারের দাম তিনি চাইলে ‘ইয়ো-ইয়োর মতো’ ওঠানামা করাতে পারেন। একই দিনে ডলার সূচক চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। এই বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ডলারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি এবং এ নিয়ে আপত্তি তোলায় ইউরোপের আটটি দেশের ওপর দ্বিগুণ অঙ্কের শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এর পরপরই ডেনমার্কের পেনশন তহবিল একাডেমিকারপেনশন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। গ্রিনল্যান্ডের সিসা পেনশন তহবিলও একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে। যদিও এই অঙ্ক বৈশ্বিক ট্রেজারি বাজারের তুলনায় সামান্য, তবু বিশ্লেষকদের মতে ট্রাম্প এই পদক্ষেপে ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
নাটিক্সিস ব্যাংকের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে রাজনৈতিক ঝুঁকি ঢুকিয়ে দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি বা ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের মতো ঘটনাগুলো শুধু প্রতিপক্ষ নয়, মিত্র দেশগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের ঝুঁকি কমাতে বাধ্য করছে। এর ফলে ডলারের নিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

ইউরোপীয় আস্থায় চিড়
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্প সাময়িকভাবে গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত শুল্ক স্থগিতের ঘোষণা দিলেও ইউরোপীয় নেতাদের মতে আস্থার ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন সেখানে ইউরোপের নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের আটটি দেশ এখনো শীর্ষ ২০ বিদেশি ধারকের মধ্যে রয়েছে এবং মোট বিদেশি ধারণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ইউরোপীয় দেশগুলোর হাতে। তবু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
দেশের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। ঋণসীমা বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ২০২৫ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের প্রকাশ্য আক্রমণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবন সংস্কার নিয়ে তদন্তও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-ইরিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, এতে ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও দুর্বল হতে পারে।

পেনশন তহবিলের সরে যাওয়া
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশাপাশি সুইডেনের বড় পেনশন তহবিল আলেক্টাও তাদের অধিকাংশ ট্রেজারি বিনিয়োগ বিক্রি করেছে। ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতিকে তারা এর কারণ হিসেবে দেখিয়েছে।
স্বর্ণের দিকে ঝোঁক
ডলার ও ট্রেজারি নিয়ে আস্থার টানাপোড়েনে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে স্বর্ণ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৫ হাজার ১০০ ডলার ছাড়ায়। ২০২৫ সালজুড়ে দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বড় আকারের স্বর্ণ কেনা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সুদের হার কমার প্রত্যাশা এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। পোল্যান্ড ১৫০ টন স্বর্ণ কেনার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ স্বর্ণধারী দেশের তালিকায় ওঠার লক্ষ্য জানিয়েছে।
অন্যান্য ধাতু ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
স্বর্ণের সঙ্গে সঙ্গে রুপা ও প্লাটিনামের দামও বেড়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২৬ সালের শেষে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, বেসরকারি খাতের বৈচিত্র্যকরণ এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
চীনা সম্পদের প্রতি আগ্রহ
ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়ায় কিছু বিনিয়োগকারী চীনের দিকে তাকাচ্ছেন। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নীতিগত স্পষ্টতা ও শিল্পখাতে উন্নয়নের কারণে চীনা সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে অগ্রগতি এর উদাহরণ।
ডলার নির্ভরতা কমানোর চীনা কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও রাশিয়ার ওপর আরোপিত আর্থিক শাস্তির পর চীন ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে আরও সতর্ক হয়েছে। তারা ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াতে চাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ধারণ কমাচ্ছে। এক সময় যেখানে চীনের হাতে ছিল ১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের ট্রেজারি, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে ৬৮২ দশমিক ৬ বিলিয়নে।

ভারতসহ উদীয়মান বাজার
শুধু চীন নয়, ভারতসহ অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ধারণ কমিয়েছে। ভারতের ধারণ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। একই সঙ্গে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা স্বর্ণ কেনা অব্যাহত রেখেছে।
আস্থার সীমাবদ্ধ পরিবর্তন
তবে সব বিশ্লেষক মনে করেন না যে এই অস্থিরতা স্থায়ী পরিবর্তন আনবে। ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চার্লস চ্যাংয়ের মতে, সাম্প্রতিক ওঠানামা বাজারের স্বাভাবিক শব্দমাত্র। এটি ঝুঁকি তৈরি করলেও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার দিক পরিবর্তন করা এত সহজ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















