দীর্ঘ প্রায় বিশ বছরের আলোচনা শেষে অবশেষে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাল ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নয়াদিল্লিতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সমঝোতা সামনে এলো, তাকে ইউরোপীয় নেতৃত্ব ‘সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশ্ব রাজনীতির টালমাটাল সময়ে এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বার্তা ও সময়ের গুরুত্ব
ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লায়েন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তার উপস্থিতিতেই চুক্তির ঘোষণা আসে। এই সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত বাণিজ্য নীতি ও চীনের সস্তা পণ্যের আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে এই সমঝোতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

শুল্ক কমানো ও বাজার উন্মুক্তকরণ
চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপ থেকে আসা গাড়ির ওপর ভারতের শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। যেখানে এতদিন আমদানিকৃত গাড়ির ওপর শুল্ক ছিল অত্যন্ত বেশি, সেখানে এখন তা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা ভারতের বাজারে বড় সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য ও ওষুধের মতো খাতে ভারতের শুল্ক ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হবে।
ভারতের প্রাপ্তি ও ইউরোপের লাভ
এই চুক্তিতে ভারত পেয়েছে পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানিতে শুল্ক ছাড় এবং ইউরোপে উচ্চ প্রযুক্তি খাতে ভারতীয় পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ সহজ করার প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে ইউরোপের জন্য এটি বিশাল জনসংখ্যার একটি দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে প্রবেশের পথ খুলে দিল। ইউরোপীয় নেতৃত্বের ভাষায়, এই চুক্তি প্রায় দুই শত কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক নীতি ভারত ও ইউরোপ উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং ইউরোপের ওপর সম্ভাব্য নতুন করের হুমকি এই দুই পক্ষকে বিকল্প অংশীদার খুঁজতে বাধ্য করে। সেই বাস্তবতায় ভারত–ইউরোপ বাণিজ্য চুক্তি একটি কৌশলগত আশ্রয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গাড়ি শিল্পে নতুন সম্ভাবনা
ইউরোপের গাড়ি শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ ব্যয়, চীনা প্রতিযোগিতা ও পরিবেশগত নিয়মের চাপে রয়েছে। ভারতের বাজারে শুল্ক কমলে এই শিল্প কিছুটা স্বস্তি পাবে বলে বিশ্লেষকদের মত। ইতিমধ্যে একাধিক ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতা ভারতে উৎপাদন চালালেও কঠোর নিয়ম ও কর কাঠামো তাদের সম্প্রসারণে বাধা হয়ে ছিল।

বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ চিত্র
বর্তমানে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্যের কাছাকাছি। নতুন এই চুক্তির ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইউরোপ থেকে ভারতে রপ্তানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ও শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপ ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি উপকারী অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















