কানাডার প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুব ভালোভাবেই চেনেন। একটি কথা বোঝাতে তিনি এক ভিন্নমতাবলম্বীর লেখা উদ্ধৃত করেছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখলেন, “প্রিয় প্রধানমন্ত্রী কার্নি, অনুগ্রহ করে এই চিঠিটিকে জানিয়ে রাখুন যে শান্তি বোর্ড আপনাকে কানাডার পক্ষ থেকে যোগদানের যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা হলো। ভবিষ্যতে যে কোনো সময় গঠিত হতে যাওয়া সর্বকালের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নেতৃবৃন্দের বোর্ডে আপনার অংশগ্রহণ আর থাকছে না। বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
গত এক সপ্তাহে ট্রাম্প যা কিছু করেছেন, তাতে তিনি ক্ষুদ্র, বিভ্রান্ত ও তুচ্ছ বলেই ধরা পড়েছেন। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর সর্বশেষ নাটক শুরু হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার অভিযোগ দিয়ে, আর শেষ হয় মার্ক কার্নিকে তাঁর তথাকথিত শান্তি বোর্ড থেকে বাদ দিয়ে। ট্রাম্পের কাছে শান্তিও তাঁর নিরেট লেনদেনভিত্তিক মানসিকতার ঊর্ধ্বে নয়। সেই লেনদেনের রাজনীতি ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করাই কার্নিকে ট্রাম্পের রোষের মুখে ফেলেছে।
গত সপ্তাহে দাভোসে কার্নির দেওয়া ভাষণের দুটি দিক আমার চোখে পড়ে। প্রথমত, তিনি চারবার ‘আধিপত্যশীল শক্তি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। আর ‘আমেরিকা’ শব্দটি বলেন মাত্র একবার, তাও শুধু ‘আমেরিকান আধিপত্য’ বোঝাতে। আজ আমাদের উত্তর দিকের প্রতিবেশীদের কাছে আমরা আর আগের সেই পরিচিত আমেরিকা নই। আমরা এখন শুধু একটি আধিপত্যশীল শক্তি।
দ্বিতীয়ত, কার্নি ভ্যাকলাভ হাভেলের সেই গল্পটি স্মরণ করান, যেখানে বলা হয়েছে কীভাবে সাম্যবাদ নিজেকে টিকিয়ে রাখে। ‘ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতা’ প্রবন্ধে হাভেল কল্পনা করেছিলেন এক মুদিখানির মালিককে, যে তার দোকানের জানালায় লিখে রাখে, “দুনিয়ার শ্রমিকেরা এক হও।” কেন সে এটা করে? হাভেলের ব্যাখ্যা ছিল, না করলে সর্বনাশ নেমে আসত।
কার্নি বলেন, হাভেল একে বলেছিলেন ‘মিথ্যার ভেতরে বেঁচে থাকা’। ব্যবস্থার শক্তি সত্য থেকে আসে না, আসে সবাই মিলে সত্যের অভিনয় করার ইচ্ছা থেকে। আর সেই একই জায়গায় তার দুর্বলতাও। যখন একজনও সেই অভিনয় বন্ধ করে, যখন মুদিখানির মালিক সাইনবোর্ডটি নামিয়ে ফেলে, তখনই ভাঙন শুরু হয়।
দাভোসে কার্নি নিজেই সেই মুদিখানির মালিক হতে চেয়েছিলেন। সবার চোখের সামনে তিনি সাইনবোর্ড নামাতে চেয়েছিলেন। সে সময় ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছিলেন, গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার হাতে না এলে ইউরোপের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে। আপাতত সেই হুমকি থেমেছে, কিন্তু কত দিনের জন্য?
কার্নির ভাষায়, বড় শক্তিগুলো এখন অর্থনৈতিক সংযোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। শুল্ককে চাপ তৈরির উপায় বানাচ্ছে। আর্থিক অবকাঠামোকে জবরদস্তির হাতিয়ার করছে। সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগাচ্ছে। যখন সংযোগই অধীনতার উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তখন পারস্পরিক লাভের মিথ্যার ভেতরে বেঁচে থাকা যায় না।
কার্নির বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করার মতো করেই ট্রাম্প নিজের ভাষণে এক ধরনের হুমকিস্বরূপ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “গতকাল আমি তোমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি। তিনি খুব কৃতজ্ঞ ছিলেন না। কানাডার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত আমাদের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই কানাডা টিকে আছে। মার্ক, পরের বার কথা বলার সময় এটা মনে রেখো।”
অনেক সময় বিশ্বনেতারা একে অন্যকে না বোঝার কারণে সংঘাতে জড়ান। কিন্তু কার্নি আর ট্রাম্প একে অপরকে খুব ভালোভাবেই বোঝেন।
ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকার যে চিত্র কার্নি তুলে ধরেছেন, তা অস্বীকার করা কঠিন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে আমি তাঁর কয়েকজন উপদেষ্টাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের ধারণা কী। সবাই প্রায় একই কথা বলেছিলেন। আমেরিকার হাতে অনেক চাপ তৈরির ক্ষমতা আছে, যা সে ব্যবহার করে না। ট্রাম্পের অধীনে সেই ক্ষমতা ব্যবহার শুরু হবে।

বিশ্ব কীভাবে চলে, সে বিষয়ে এটিই ট্রাম্পের সবচেয়ে মৌলিক বিশ্বাস। নিজের লেখা এক বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, শক্তির জায়গা থেকে দরকষাকষি করাই সবচেয়ে ভালো কৌশল। আর চাপ তৈরির ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। অন্য পক্ষের এমন কিছু দরকার, যা সে ছাড়া চলতে পারে না, সেটাই আসল ক্ষমতা।
ট্রাম্পবাদের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, এতে কোনো আদর্শবাদ নেই। এখানেই এটি হাভেলের বিশ্লেষণকে উল্টোভাবে প্রমাণ করে। কার্নি হাভেলের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ দিয়েছিলেন। হাভেলের মতে, কিছু মিথ্যা অন্যগুলোর চেয়ে শক্তিশালী।
হাভেল ব্যাখ্যা করেছিলেন, মুদিখানির মালিক যখন ওই সাইনবোর্ড ঝোলায়, তখন সে আসলে বলছে, আমি জানি আমাকে কী করতে হবে। আমি নিয়ম মেনে চলি। আমি নির্ভরযোগ্য। আমি বাধ্য, তাই আমাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হোক। এই বার্তা একদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে, অন্যদিকে সম্ভাব্য অভিযোগকারীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার ঢাল। এই স্লোগানের অর্থ তার অস্তিত্বের সঙ্গেই জড়িত।
যদি তাকে লিখতে বলা হতো, আমি ভীত, তাই নিঃশর্তভাবে বাধ্য, তবে সে তা ঝোলাতে লজ্জা পেত। কারণ সে মানুষ, তার আত্মসম্মান আছে। তাই আনুগত্য প্রকাশ করতে হয় এমন এক ভাষায়, যা বাইরে থেকে আদর্শের ছাপ দেয়। যাতে সে নিজেকেই বলতে পারে, দুনিয়ার শ্রমিকেরা এক হলে দোষ কী?
এই সাইনবোর্ড তাকে নিজের আনুগত্যের নীচু ভিত্তি আড়াল করতে সাহায্য করে, আর একই সঙ্গে ক্ষমতার নীচু ভিত্তিও ঢেকে রাখে। উঁচু কিছুর আড়ালে লুকিয়ে রাখে সব।
ট্রাম্পবাদ কোনো উঁচু কিছুর আড়ালে লুকোয় না। ট্রাম্পের আকর্ষণের একটি কারণ হলো, তিনি নিজের লোভকে রূঢ় সততা হিসেবে হাজির করেন। তিনি বলেন, সবাই এমনই করছে, আমি শুধু স্বীকার করছি। ভোটাররা মনে করে রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্ত। ট্রাম্প নিজের দুর্নীতি প্রকাশ্যে দেখিয়ে সেই ধারণাকেই সত্য প্রমাণ করেন। এতে তাদের ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা আরও পোক্ত হয়, আর তারা এমন এক নেতাকে চায়, যে এই ব্যবস্থার নিয়মে পারদর্শী।
কিন্তু এটিও এক ধরনের মিথ্যা এবং দুর্বলতা। মিথ্যা এই কারণে যে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি সবার নয়। খুব কম মানুষই তাঁর মতো নগ্নভাবে লেনদেনমুখী বা গভীরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। আর এটি দুর্বলতা, কারণ এটি তার বিপরীত কিছুর জন্য আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
এই কারণেই কার্নির ভাষণ এত আলোড়ন তুলেছিল। তিনি নিজেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিনি নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা দিয়ে শুধু লাভ তোলাই তাঁর লক্ষ্য নয়। এটি শুধু তীক্ষ্ণ ভাষণ ছিল না, ছিল এক সাহসী কাজ। এমন এক কাজ, যার অস্তিত্বই ট্রাম্পবাদ অস্বীকার করে।
আমি বলছি না, কার্নির জন্য বা অন্য নেতাদের জন্য এটি সহজ হবে। ট্রাম্প প্রতিহিংসাপরায়ণ। তিনি ঠিকই বলেন, আমেরিকা চাইলে যে কোনো দেশের ওপর ভয়াবহ ক্ষতি চাপিয়ে দিতে পারে।
তবে কার্নিও ঠিকই বলেন, আমেরিকার শক্তি অনেকটাই নির্ভর করে অন্য দেশগুলো সেই শক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকতে কতটা রাজি, তার ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, আধিপত্যশীল শক্তি সম্পর্ককে অনবরত অর্থে রূপান্তর করতে পারে না। মিত্ররা অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষা খুঁজবে। তারা বিকল্প বাড়াবে, সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠন করবে। যে সার্বভৌমত্ব একসময় নিয়মের ওপর দাঁড়িয়েছিল, ভবিষ্যতে তা দাঁড়াবে চাপ সহ্য করার ক্ষমতার ওপর।
কানাডা ইতিমধ্যেই সেই পথেই হাঁটছে, আংশিকভাবে চীন ও কাতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে।
এই পৃথিবী গড়ে উঠেছে সম্পর্কের ওপর, চাপের ওপর নয়। আর সম্পর্ক তৈরি হয় পারস্পরিকতা ও সম্মানের মাধ্যমে। আমেরিকার অব্যবহৃত শক্তি চিহ্নিত করাই ট্রাম্পের কৃতিত্ব নয়। তাঁর অন্ধত্ব হলো, তিনি বুঝতে পারেন না যে আমাদের শক্তির উৎস ছিল আমাদের সংযম।
এজরা ক্লেইন 



















