ইরানে যখন রাস্তায় রাস্তায় রক্ত ঝরছে, তখন বিশ্বের কূটনৈতিক ভাষা ঘুরপাক খাচ্ছে পরিচিত বাক্যে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, উদ্বেগ জানানো হচ্ছে, নিন্দা করা হচ্ছে। এরপর সবাই এগিয়ে যাচ্ছে পরের আলোচনায়। এই নীরবতা আর বিলম্বের মূল্য যে কত ভয়াবহ, তা প্রতিদিন বাড়ছে।
ইরানে দমন-পীড়নের বাস্তব চিত্র
গত জানুয়ারির শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মুখে ইরানের শাসকগোষ্ঠী প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। নিরাপত্তা বাহিনী সামরিক কায়দায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা চালায় বহু শহরে। ইন্টারনেট আংশিক ফিরতেই সামনে আসে ভয়ংকর সত্য। নিজ দেশের নাগরিকদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে গুলি চালানো হয়েছে নির্বিচারে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা স্বীকার করেছেন কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তবে স্বতন্ত্র সূত্র ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে এই সংখ্যা বহু গুণ বেশি, যা হাজার হাজার পরিবারকে শোকে ডুবিয়েছে।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কেন কেবল আনুষ্ঠানিক
জাতিসংঘে আলোচনা হয়েছে, উদ্বেগ জানানো হয়েছে, বিবৃতি এসেছে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। ইরানের শাসকরা এই রীতি ভালো করেই জানে। তারা বোঝে, নিন্দা শেষে বাস্তবে কিছুই হবে না। অতীতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকট কিংবা সুদানের দারফুর অঞ্চলে যা ঘটেছে, তা এই নীরবতারই উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও বাস্তবতা
বিক্ষোভের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছিল। বলা হয়েছিল, সহিংসতা চললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেই সহায়তা আর এল না। ফলে ইরানের রাস্তায় যারা জীবন বাজি রেখে নেমেছিল, তাদের অনেকেই এখন নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি নতুন প্রশ্ন তুললেও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

সামরিক হস্তক্ষেপ মানেই আগ্রাসন নয়
অনেকেই আশঙ্কা করেন, সামরিক পদক্ষেপ মানে আগ্রাসন ও দীর্ঘ যুদ্ধ। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। বসনিয়া, কসোভো, পূর্ব তিমুর কিংবা পশ্চিম আফ্রিকার গাম্বিয়ায় সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক চাপ ও শক্তি প্রয়োগে গণহত্যা ঠেকানো গেছে বা স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হওয়া উচিত দমনযন্ত্রের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, যাতে গুলি, গ্রেপ্তার আর ভয় দেখিয়ে মানুষকে স্তব্ধ করা না যায়।
ইরানের জনগণের বার্তা
বিক্ষোভকারীরা বিদেশি সেনা চায় না। তারা চায়, বিশ্ব যেন চোখ ফিরিয়ে না নেয়। সাম্প্রতিক আন্দোলনে বহু মানুষ শাসকগোষ্ঠীর প্রতীক পুড়িয়ে পুরোনো জাতীয় প্রতীক তুলে ধরেছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, সীমিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ তাদের কাছে শত্রুতা হিসেবে দেখা নাও হতে পারে।

নীরবতার রাজনীতি ও ইতিহাসের বিচার
প্রায়ই বলা হয়, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু এই যুক্তি যখন স্থবিরতায় রূপ নেয়, তখন তা স্বৈরশাসকদের সাহস বাড়ায়। বার্তা যায়, যথেষ্ট মানুষ মারলে বিশ্ব ভয় পেয়ে সরে দাঁড়াবে। ইতিহাস কিন্তু নীরবতাকে ক্ষমা করে না। রুয়ান্ডার গণহত্যা আজ স্মরণ করা হয় ভীরুতার উদাহরণ হিসেবে, হস্তক্ষেপের বাড়াবাড়ি হিসেবে নয়।
শেষ সুযোগ কি সামনে
এক দশক আগেও ইরানে নির্বাচনী আন্দোলনের সময় বিশ্ব সুযোগ হারিয়েছিল। আজ আবার সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ভবিষ্যৎ ইতিহাসের পাতায় শুধু পর্যবেক্ষণের কথা লেখা থাকলে, তার পাশে লাশের সংখ্যাও লেখা থাকবে। নীরবতারই যে সবচেয়ে বড় মূল্য, সেটাই আজ ইরানের রাজপথে স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















