উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার এক ব্যস্ত মানি চেঞ্জারের সামনে দাঁড়িয়ে ৪৬ বছর বয়সী এক নারী কৃষক শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন একটি প্লাস্টিক কার্ড। দীর্ঘ প্রায় চৌদ্দ বছরের গৃহযুদ্ধ তাঁর জীবন ও জীবিকা ভেঙে দিয়েছে। প্রযুক্তি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না। তবু ওই কার্ডেই জমা ছিল পাঁচশ ডলার সমমূল্যের অর্থ, যা দিয়ে তিনি আবার নিজের খামার দাঁড় করানোর স্বপ্ন দেখছিলেন। টাকা হাতে পেয়ে হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা জানান হালা মাহমুদ আলমাহমুদ। তাঁর একটাই প্রশ্ন ছিল, এমন প্রযুক্তি এল কোথা থেকে। উত্তর শুনে তিনি বিস্মিত হন। আফগানিস্তান।
অপ্রত্যাশিত উদ্ভাবনের জন্মভূমি
তালেবান শাসনের কারণে যে দেশটিকে অনেকেই প্রযুক্তি বিমুখ ও বিচ্ছিন্ন মনে করেন, সেই আফগানিস্তান থেকেই উঠে এসেছে মানবিক সহায়তা বিতরণের এক নতুন ডিজিটাল পথ। যুদ্ধ ও সংকটে ক্ষতবিক্ষত দেশগুলোর জন্য ব্লকচেইনভিত্তিক অর্থ সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করছে আফগান স্টার্টআপ হেসাবপে। এই প্রযুক্তিতে চালিত হয়েছিল হালা মাহমুদের কার্ড।
হেসাবপের প্রোগ্রামার জাকিয়া হুসাইনি বলেন, নিজেদের জীবনে ই তাঁরা সংকট দেখেছেন। তাই কীভাবে কার্যকর সমাধান তৈরি করতে হয়, সেটা ও তাঁরা জানেন।

মানবিক সহায়তায় জাতিসংঘের ভরসা
এই প্ল্যাটফর্মের প্রথম বড় ব্যবহারকারীদের মধ্যে ছিল জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা। আফগানিস্তানে প্রায় ছিয়াশি হাজার পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে তারা এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যতম বড় সরকারি ব্লকচেইন সহায়তা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। দাতব্য সংস্থা মার্সি কর্পস হেসাবপের সঙ্গে কাজ করে সিরিয়ায় এই সেবা সম্প্রসারণ করেছে। একই ধরনের কর্মসূচি সুদান ও হাইতিতে ও চালুর প্রস্তুতি চলছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থ পৌঁছানোর জটিলতা
সিরিয়ার মতো দেশে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানো অত্যন্ত কঠিন। নগদের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকের অনাগ্রহ এবং রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠানের উচ্চ ফি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। হেসাবপে এই বাধাগুলো পাশ কাটিয়ে সহায়তা সংস্থাগুলোকে সরাসরি মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
আর্থিক বিপর্যয় থেকে ডিজিটাল সমাধান

হেসাবপের উদ্যোক্তা সানজার কাকার আগে আফগানিস্তানের বড় বেতন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান চালাতেন। কিন্তু বিদেশি সেনা প্রত্যাহার ও তালেবান ফেরার পর দেশটির আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ব্যাংকিং কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। তখন ই তিনি ব্লকচেইনের দিকে ঝুঁকেন। মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক এই ব্যবস্থায় ব্যাংক ছাড়াই এক ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে আরেকটিতে তাৎক্ষণিক অর্থ পাঠানো যায়।
বর্তমানে আফগানিস্তানে এই প্ল্যাটফর্মে ছয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজারের বেশি ওয়ালেট রয়েছে। প্রতি মাসে স্থানীয় মুদ্রা সমর্থিত স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রায় প্রায় ছয় কোটি ডলারের লেনদেন হয়।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন মানদণ্ড
জাতিসংঘ জানায়, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন খরচ কমেছে, অপেক্ষার সময় কমেছে এবং অর্থ কোথায় যাচ্ছে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাচ্ছে। দাতাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নগদ সহায়তা দ্রুত হলেও তা নজরদারিতে দুর্বল। ব্লকচেইন প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড রেখে দেয়, যা আস্থা ফেরাতে সহায়ক।

হেসাবপের ব্যবস্থায় রয়েছে রিয়েল টাইম নজরদারি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই এবং সন্দেহজনক লেনদেনে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা। এই প্রযুক্তি সন্ত্রাসী অর্থায়ন, অর্থপাচার কিংবা অনলাইন প্রতারণা শনাক্ত করার জন্য তৈরি।
সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবিক সহায়তায় এই পদ্ধতির সুবিধা বেশি। তবে স্থানীয় মুদ্রা সমর্থিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় রাজনৈতিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিও থেকে যায়। ডিজিটাল অর্থ নিরাপদ হলেও তা ঘরের কোণে লুকিয়ে রাখা যায় না।
যুদ্ধের পর নতুন জীবনের আশ্বাস
সিরিয়ায় হালা মাহমুদের পাশে লাইনে দাঁড়ানো তরুণ আবদুল হালিম হাসান বলেন, একদিন তিনি এই কার্ডকেই নিয়মিত ব্যাংক হিসাব হিসেবে ব্যবহার করতে চান। আপাতত যুদ্ধের পর নতুন জীবন শুরু করার জন্য এই অর্থই তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















