মার্কিন জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থার অনুপ্রেরণা স্থল হিসেবে পরিচিত ইয়োসেমাইট জাতীয় উদ্যান আজ গভীর সংকটে। পাহাড়, উপত্যকা আর বিস্তৃত ঘাসের প্রান্তর যেসব দৃশ্য একসময় সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, সেখানে এখন বাড়ছে বিশৃঙ্খলা। রেঞ্জার এর অভাব, নজরদারির ঘাটতি আর প্রশাসনিক কাটছাঁট মিলিয়ে উদ্যানটি যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে।
রেঞ্জারহীন প্রবেশ আর বাড়তে থাকা বিশৃঙ্খলা
দীর্ঘদিন ধরে ইয়োসেমাইটে প্রবেশের মুখে সবুজ আর খাকি পোশাকের রেঞ্জার এর উপস্থিতিই ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। তাঁরা প্রবেশ ফি নিতেন, নিয়ম বুঝিয়ে দিতেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরের এক শীতল সকালে সেই পরিচিত দৃশ্য আর দেখা যায়নি। প্রবেশপথে রেঞ্জার না থাকায় অনেক পর্যটক বিনা টিকিটে উদ্যানে ঢুকে পড়েন। অনেকেই ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো বিশেষ সুবিধা। বাস্তবে এটি ছিল গুরুতর জনবল সংকটের ফল।
নিয়মিত দর্শনার্থী ও পরিবেশবাদীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর জুড়ে রেঞ্জার এর উপস্থিতি ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম। এর ফল হিসেবে বেড়েছে ময়লা ফেলা, নিষিদ্ধ স্থানে ঝাঁপ দেওয়া, আকাশে ড্রোন ওড়ানো সহ নানা অনিয়ম। পর্যটনের বন্যতা প্রকৃতিকে ছাপিয়ে গেছে।

প্রশাসনিক কাটছাঁটের প্রভাব
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই যুক্ত করছেন বর্তমান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে। গত এক বছরে ইয়োসেমাইট পরিচালনাকারী জাতীয় উদ্যান সংস্থায় স্থায়ী কর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ছাঁটাই, স্বেচ্ছা অবসর আর অবসর গ্রহণ মিলিয়ে কর্মী সংখ্যা প্রায় এক চতুর্থাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠনগুলোর দাবি।
একই সময়ে প্রবেশ ফি আর সংরক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। কিছু জাতীয় দিবসে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ বাতিল হয়েছে, আবার কিছু নির্দিষ্ট দিনে বিনা টিকিটে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও কম নয়।
দায়িত্বের ভারে বিজ্ঞানীরা
রেঞ্জার সংকটের প্রভাব এতটাই গভীর যে গবেষণায় নিয়োজিত বিজ্ঞানীদেরও নেমে আসতে হয়েছে দৈনন্দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে। কোথাও কোথাও তাঁরা জনসাধারণের শৌচাগার পরিষ্কার করছেন। সাবেক এক রেঞ্জারের ভাষায়, পরিস্থিতি হতাশাজনক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

পর্যটকের ঢল, ব্যবস্থার চাপ
এর মধ্যেই পর্যটকের সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে গত গ্রীষ্ম ছিল অন্যতম ব্যস্ত সময়। সরকার বন্ধ থাকার সময় উদ্যানে প্রবেশ অবাধ থাকায় শরৎকালে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে ভুল পথে গাড়ি চালানো, সংবেদনশীল ঘাসের জমিতে গাড়ি রাখা আর নিষিদ্ধ পাহাড়ি ঝাঁপের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
ইতিহাস আর বর্তমানের সংঘাত
ইয়োসেমাইটের সৌন্দর্যই একসময় পুরো জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থার ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই উপত্যকাকে জনসাধারণের জন্য সংরক্ষিত করার সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের পথ দেখিয়েছিল। আজ সেই ঐতিহ্যবাহী স্থানে নিয়ন্ত্রণের অভাব নতুন প্রশ্ন তুলছে।
তবু উদ্যানে ঘুরে বেড়ানো মানুষের চোখে ইয়োসেমাইট এখনো আবেগের জায়গা। কেউ সন্তানের বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে এসেছে, কেউ বহু দূর দেশ থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে। কিন্তু অনেকেই অবাক হচ্ছেন প্রবেশ ফি না নেওয়া বা নিয়মের শিথিলতা দেখে। এমনকি অনুমতি ছাড়াই বিপজ্জনক পাহাড়ে ওঠার ঘটনাও ঘটছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
পর্যটন গাইড আর পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন, রেঞ্জার আর কর্মীর অভাবে দর্শনার্থীদের সচেতন করার কাজটাই হচ্ছে না। ফলে অনিয়ম বাড়ছে। গত বছর কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে প্রতীকী সংকেত তোলার ঘটনাও ঘটেছে, যা প্রশাসনের সঙ্গে কর্মীদের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়।
সংরক্ষণ পরিকল্পনা, বিপন্ন প্রাণী গবেষণা কিংবা আগুন ও বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাজগুলো এখন পিছিয়ে পড়ছে। সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, প্রতিদিনের কাজ কোনোমতে চললেও এই অবস্থা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















