জাপানে চীনা পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়াকে স্বস্তির চোখে দেখছেন অনেক সাধারণ জাপানি। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ভিড় ও কোলাহলে বিরক্ত মানুষেরা বলছেন, এবারের চন্দ্র নববর্ষে শহরগুলো তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকবে। তবে পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চীনা পর্যটক কমলেও সামগ্রিকভাবে শিল্পখাতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা আপাতত নেই।
চীনের ভ্রমণ সতর্কতা ও পটভূমি
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে সোমবার একটি নির্দেশনা জারি করে নাগরিকদের জাপানে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানানো হয়। এতে জাপানে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে অপরাধ বৃদ্ধির অভিযোগের কথা বলা হয়। এই সতর্কতা আসে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ার প্রেক্ষাপটে।

জাপানে আগমন কমলেও মোট পর্যটক সংখ্যা স্থিতিশীল
জাপান ন্যাশনাল ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে জাপানে এসেছেন প্রায় তিন লাখ ত্রিশ হাজার পর্যটক, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি কম। তবে একই মাসে মোট বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ লাখ ২০ হাজার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩.৭ শতাংশ বেশি। দুর্বল ইয়েনের সুযোগ নিয়ে অন্য দেশগুলোর পর্যটক বাড়ায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
তাইওয়ান ইস্যু ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব
গত নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সংসদে তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রসঙ্গ তোলার পর থেকেই চীন থেকে বুকিং কমতে শুরু করে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দেখে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অবস্থান বজায় রেখেছে। এই ইস্যুতে চীন জাপানের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় এবং নাগরিকদের ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি
চীনা পর্যটক কমলেও জাপানের অনেক ট্যুর অপারেটর তাতে উদ্বিগ্ন নন। কিয়োটোভিত্তিক সেরকা ট্রাভেল কোম্পানির পরিচালক কেই তামুরা জানান, তাইওয়ান, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর বুকিং পাচ্ছেন তারা। তার মতে, গত বছরই ব্যবসা যথেষ্ট ব্যস্ত ছিল এবং এ বছরও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম থাকবে। দুর্বল ইয়েনের কারণে অন্যান্য দেশের পর্যটকদের আগমন বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশীয় পর্যটন ও আরামদায়ক পরিবেশ
বিদেশ ভ্রমণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় জাপানের ভেতরেই ভ্রমণ বাড়ছে। কিয়োটোর মতো শহরে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বড় আকারের চীনা ট্যুর গ্রুপ না থাকায় মন্দির ও জাদুঘরগুলোতে ভিড় কমেছে, যা স্থানীয়দের কাছে অনেক বেশি আরামদায়ক বলে মনে হচ্ছে।

অঞ্চলভেদে ভিন্ন অভিজ্ঞতা
শিকোকু দ্বীপের তোকুশিমা শহরের গাইডিং ব্যবসায়ী ইউকি বান্দো জানান, তার এলাকায় চীনা পর্যটকের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তাইওয়ান ও ইউরোপ থেকে ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ট্রাভেল এজেন্সিগুলো নতুন করে অঞ্চলটি ঘুরে দেখছে। তার মতে, চীনা পর্যটক না থাকলেও এখানকার শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না।
নিরাপত্তা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন
চীনা পর্যটকদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বান্দো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা দ্রুতই পর্যটন শিল্পে ছড়িয়ে পড়ত, কিন্তু তেমন কিছু হয়নি।
অনলাইন প্রতিক্রিয়া ও জনমত
জাপানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই চীনের নিরাপত্তা দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, চীনা পর্যটক না থাকলেও পশ্চিমা ও তাইওয়ানের পর্যটকেরা ভালো আচরণ নিয়ে জাপানে আসছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ থেকে শহরগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে।
চীনা ‘ইতিয়াও লং’ ব্যবস্থার প্রভাব
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনা পর্যটকের অর্থনৈতিক প্রভাবও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে। কারণ ‘ইতিয়াও লং’ বা ‘এক ড্রাগন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনা মালিকানাধীন বিমান, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ট্যুর কোম্পানির মধ্যেই পুরো ভ্রমণব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। এতে মান্দারিন ভাষা ও চীনা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহৃত হয়, ফলে জাপানের মূল অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কম হয়। শিল্পখাতের ধারণা অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে বিপুল অঙ্কের অর্থ শেষ পর্যন্ত চীনে ফিরে যায়।
সব মিলিয়ে, চীনা পর্যটক কমে গেলেও জাপানের পর্যটন শিল্প আপাতত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের একাংশ এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















