মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতিকে অনেকেই একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখতে চাইছেন। ইরানকে ঘিরে কয়েক মাসের জটিল আলোচনা শেষে যে কাঠামোগত সমঝোতা সামনে এসেছে, সেটিকে কেউ কেউ যুদ্ধোত্তর স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং এমন একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, যার সাফল্য বা ব্যর্থতা এখনও অনিশ্চিত।
সবচেয়ে আগে যে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার, তা হলো এই সমঝোতাকে বিজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কয়েক মাস আগেও ওয়াশিংটনের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। সেখানে শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন কিংবা ইরানের নিঃশর্ত নতি স্বীকারের মতো ধারণা উচ্চারিত হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে অবস্থানে পৌঁছানো হয়েছে, তা মূলত সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ। দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাই এর প্রধান অর্জন।
তবু এই চুক্তিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার তালিকা দীর্ঘ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কীভাবে সীমিত হবে, তার বিস্তারিত কাঠামো এখনও নির্ধারিত হয়নি। হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আঞ্চলিক মিত্র ও প্রতিপক্ষদের আচরণও এই সমঝোতার বাইরে থেকে যেতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেহরানে এখনো সেই রাজনৈতিক শক্তিই ক্ষমতায় রয়েছে, যারা বহু বছর ধরে নিজেদের বিপ্লবী পরিচয়কে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রেখেছে।
এই আলোচনার একটি ব্যতিক্রমী দিক ছিল এর অর্থনৈতিক ভাষা। প্রচলিত কূটনৈতিক দর-কষাকষির পরিবর্তে আলোচনায় উঠে এসেছে বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ধারণা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ইরানের সামনে এমন একটি প্রস্তাব রেখেছেন, যার মূল কথা হলো—যদি দেশটি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমায়, পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ সীমিত করে এবং সংঘাতমুখী নীতি থেকে সরে আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের নতুন দ্বার খুলতে পারে।

এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক অনুমান: অর্থনৈতিক সুযোগ রাজনৈতিক আচরণ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা একটি রাষ্ট্র যদি উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সংযুক্তির বাস্তব সুবিধা দেখতে পায়, তবে তার নেতৃত্বও হয়তো নতুন পথ বেছে নিতে পারে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় সংশয়। ইরানের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামো এমন ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত, যারা দশকের পর দশক আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে আছেন। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তাদের আদর্শগত দূরত্ব শুধু নীতিগত নয়, অনেক ক্ষেত্রেই অস্তিত্বগত। তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিরোধ, আত্মনির্ভরতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর নির্মিত। ফলে কেবল অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেখিয়ে এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে—এমন বিশ্বাসের পক্ষে শক্ত প্রমাণ এখনও নেই।
তবে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা। কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরা শুধু বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেননি; তারা ইরানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বুঝে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়েছেন। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশা করেন, কিন্তু ইরানের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ধৈর্য নিজেই একটি কৌশলগত উপাদান। বহুস্তরীয় আমলাতন্ত্র, প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্র এবং দীর্ঘ সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া সেখানে স্বাভাবিক বাস্তবতা।
বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে ইরানকে প্রায়ই একক নেতৃত্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক বেশি জটিল। সামরিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভিন্ন মত, স্বার্থ ও গোষ্ঠী বিদ্যমান। সাম্প্রতিক সংঘাত সেই বিভাজনকে সাময়িকভাবে চাপা দিলেও যুদ্ধবিরতির পর তা আবার দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত কোন শক্তি প্রাধান্য পাবে—যারা আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেখতে চায়, নাকি যারা পুরোনো বিপ্লবী অবস্থান বজায় রাখতে আগ্রহী।
এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ মূলত সেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ওপর নির্ভর করছে। কারণ কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ভেতরে তা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সক্ষমতা থাকে। ইরানের ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষা এখনো বাকি।
এখানে আরেকটি শিক্ষা রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বারবার সামনে এনেছে। যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক ও স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসা অনেক বেশি কঠিন। সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা পুনর্গঠন করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো পর্যায়ে আলোচনার টেবিলেই ফিরতে হয়।
এই কারণেই বর্তমান সমঝোতাকে তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গুরুত্ব দিতে হবে। এটি হয়তো ইরানকে দ্রুত বদলে দেবে না। হয়তো প্রত্যাশিত রূপান্তর কখনোই ঘটবে না। কিন্তু শাসন পরিবর্তনের ব্যর্থ অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতির পর বিকল্প পথও খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।
সামনের মাসগুলোতে বোঝা যাবে, তেহরান অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগকে গুরুত্ব দেয় কি না। আপাতত এটুকুই বলা যায়—এই চুক্তি কোনো গন্তব্য নয়, বরং একটি পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার ফলাফল শুধু ইরানের ভবিষ্যৎ নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপথকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ডেভিড ইগনেশিয়াস 



















