বেইজিংয়ে এক সময় যাকে শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনা সহযোগী হিসেবে দেখা হতো, সেই জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার পতন এখন চীনের ক্ষমতার অন্দরমহলে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। ঘনিষ্ঠতা, পারিবারিক পটভূমি কিংবা দীর্ঘদিনের আস্থা—কোনোটাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে পারল না।
বিশ্বাসের দেয়াল ভাঙার মুহূর্ত
দুই হাজার চব্বিশ সালে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জেনারেল ঝাং ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও খোলামেলা। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সালিভান মন্তব্য করেছিলেন, ঝাং এমন ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন যেন তাঁকে সাবধান হয়ে চলতে হয় না। সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন নির্ভার ভাষা খুবই বিরল।
কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসী চিত্র ভেঙে পড়ে চলতি সপ্তাহান্তে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, আইন ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জেনারেল ঝাংয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ না হলেও ইঙ্গিত স্পষ্ট—বিষয়টি কেবল দুর্নীতিতে সীমাবদ্ধ নয়।

শি জিনপিংয়ের শুদ্ধি অভিযানের নতুন মাত্রা
গত তিন বছরে শি জিনপিং বহু জেনারেলকে সরিয়েছেন। তবে ঝাং ইউশিয়ার পতনকে বিশ্লেষকেরা ভিন্ন মাত্রার বলে মনে করছেন। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগীকে এভাবে প্রকাশ্যে কোণঠাসা করা চীনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
চীনা সেনাবাহিনীর সরকারি মুখপত্রে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ঝাং ইউশিয়া ও তাঁর সঙ্গে অপসারিত আরেক কমান্ডার সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ করেছেন এবং দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করেছেন। এই ভাষা অনেকের চোখে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবাধ্যতার ইঙ্গিত।
ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে শি জিনপিংয়ের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন। র্যান্ড করপোরেশনের গবেষক শান শান মেই মনে করেন, এখানে দুর্নীতির চেয়ে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, পুরো বক্তব্যে শির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত রয়েছে।

তদন্তের পেছনের কারণ নিয়ে জল্পনা
বেইজিংয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই প্রশ্ন—কেন শি জিনপিং হঠাৎ ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে গেলেন। কেউ মনে করছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে একে সরিয়ে দেওয়ার পর ঝাং অত্যধিক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন। আবার কেউ বলছেন, সেনাবাহিনীতে এতটাই গভীর দুর্নীতি ছিল যে শিকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে।
এর মধ্যেই আরেকটি গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ঝাংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে। যদিও জেক সালিভান এই দাবি নাকচ করে বলেন, পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনাগুলো ছিল সাধারণ ও আনুষ্ঠানিক।
প্রিন্সলিং পরিচয় এবং পুরোনো বন্ধন
শি জিনপিং ও ঝাং ইউশিয়া—দুজনই বিপ্লবী নেতাদের সন্তান, যাদের চীনে ‘প্রিন্সলিং’ বলা হয়। ঝাংয়ের বাবা ও শির বাবা একসময় একই অঞ্চলে লড়াই করেছেন। এই অভিন্ন পটভূমিই তাঁদের সম্পর্ক মজবুত করেছিল বলে মনে করা হয়। ঝাং ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন সেনা কমান্ডারের একজন, যিনি বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
শি জিনপিং তাঁকে অবসরোত্তর সময়েও গুরুত্বপূর্ণ পদে রেখেছিলেন এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের শীর্ষ সহসভাপতি করেন। বাস্তবে সেনাবাহিনীর দৈনন্দিন পরিচালনায় শির চোখ ও কান ছিলেন ঝাং।

ভবিষ্যৎ ও ভয়ের বার্তা
এখন যদি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়, তাহলে সামরিক আদালতে গোপন বিচার প্রায় নিশ্চিত। বিশ্লেষকদের মতে, দণ্ড থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। সাবেক চীনা দলীয় সম্পাদক দেন ইউওয়েনের ভাষায়, এই ঘটনা বেইজিংয়ের ক্ষমতাধর মহলের জন্য বড় ধাক্কা। শির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়, সেটাই প্রমাণিত হলো।
তাইওয়ান প্রশ্নে সম্ভাব্য প্রভাব
ঝাং ইউশিয়ার পতন তাইওয়ান নীতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ঝাং ছিলেন এমন একজন যিনি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ঝুঁকি ও খরচ বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে পারতেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে শি জিনপিং যে সামরিক পরামর্শ পাবেন, তা আরও কঠোর ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—এই আশঙ্কায় এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















