বিশ্ব রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে যে জোটকে দেখা হতো, সেই ন্যাটোকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি থেকে আপাত সরে আসায় সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও, এই এক মাসে তাঁর বক্তব্য ও আচরণ যে গভীর ক্ষতি করে গেছে, তা আর মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
স্বস্তির আড়ালে বড় ক্ষতি
গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযানের হুমকি থেকে সরে এলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু এই স্বস্তি আসলে ক্ষত ঢাকার চেষ্টা মাত্র। ডেনমার্কের অধীন আধা স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রকাশ্য আগ্রাসী বক্তব্য, ন্যাটোর এক অনুগত মিত্রকে লক্ষ্য করে হুমকি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ন্যাটো ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ন্যাটো শুধু সামরিক জোট নয়, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানে সকলের ওপর আক্রমণ—এই নীতিই রাশিয়া ও অন্যান্য প্রতিপক্ষকে দীর্ঘদিন নিরস্ত রেখেছে। পাশাপাশি এই জোট প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একত্রে অবস্থান নিয়ে চীনের মতো শক্তির প্রভাব ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আচরণ সেই সম্মিলিত মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।
বিশ্ব ব্যবস্থায় ফাটল
কানাডার প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, এটি কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়, বরং বিশ্ব ব্যবস্থায় এক ধরনের ভাঙন। ট্রাম্পের বক্তব্যে আইনের শাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ইচ্ছার প্রতি অবজ্ঞা স্পষ্ট। গ্রীনল্যান্ডের মানুষ ও ডেনমার্কের স্পষ্ট আপত্তি সত্ত্বেও দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কংগ্রেস ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব
স্বাভাবিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে সম্মান দেখানো হয়। কিন্তু যখন সেই সিদ্ধান্ত আইন ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে, তখন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে ওঠে। কংগ্রেসের উচিত গ্রিনল্যান্ড বা পশ্চিম ইউরোপে যেকোনো সামরিক অভিযানে অর্থ ব্যয় নিষিদ্ধ করা এবং ন্যাটোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান বন্ধের প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদে নিয়োগ স্থগিত রাখা। একই সঙ্গে শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা সংবিধানবিরোধী হওয়ায় দ্রুত বিচারিক সিদ্ধান্তের দাবি উঠেছে।
ধারাবাহিক অস্থিরতা ও বিপজ্জনক নজির
গত কয়েক সপ্তাহে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অভিযানের সিদ্ধান্ত, ভেনেজুয়েলার শাসককে ধরতে সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ, ইরানে বিক্ষোভে উসকানি দিয়ে পরে নীরব থাকা—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অগোছালো ও বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে। ন্যাটোর কোনো সদস্যের ভূখণ্ড দখলের হুমকি এই ধারাবাহিকতারই নতুন ও ভয়ংকর অধ্যায়।
মিথ্যা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় কম থাকার সমালোচনা নতুন নয় এবং এই চাপের ফলে অনেক দেশ ব্যয় বাড়িয়েছে। কিন্তু এই বাস্তব সাফল্য দেখিয়েছে যে আগ্রাসী হুমকি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। ন্যাটো মিত্রদের অবিশ্বাসযোগ্য বলা ইতিহাস বিকৃত করার শামিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর একমাত্র সক্রিয় হওয়া সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ডেনমার্কের মতো দেশ বড় মূল্য দিয়েছে।
আস্থাহীন ভবিষ্যৎ
ট্রাম্প আংশিকভাবে পিছু হটলেও ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। ন্যাটোর শক্তি শুধু অস্ত্রের জোরে নয়, পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। সেই আস্থা ভেঙে গেলে জোটটি কার্যত প্রাণহীন কাঠামোতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা অন্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে, যা ওয়াশিংটনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বিশ্ব আগের চেয়ে কম নিরাপদ
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু থেকে সরে আসা সংকটের অবসান নয়। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতার খামখেয়ালিপনা কত দ্রুত বিশ্বকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। বেইজিং ও মস্কো এই বিভাজনে খুশি হলেও, সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ একটাই—বিশ্ব আগের চেয়ে কম নিরাপদ।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















