বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর নতুন অবস্থান। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি ও আগ্রাসী বাণিজ্য কৌশল এই দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে ইউরোপ, কানাডা, ভারতসহ একাধিক অর্থনীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কৌশল ও প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি এবং পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসা মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগে যেখানে শুল্ক ব্যবহৃত হতো বাণিজ্যিক অসন্তোষ প্রকাশের জন্য, সেখানে এখন তা ভূখণ্ড ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রথমবারের মতো এই কৌশলের মুখে ইউরোপ ও কানাডার মতো দেশগুলো শক্ত প্রতিরোধ ও পাল্টা প্রস্তুতি দেখিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ক্রমেই সুরক্ষাবাদের দিকে ঝুঁকছে, তখন ইউরোপ, কানাডা ও অন্যান্য অর্থনীতি নিজেদের উদ্যোগে বাণিজ্য উদারীকরণ এগিয়ে নিচ্ছে। বহু দেশের কাছে এখন স্পষ্ট, নিয়ম ভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যেতে চাইছে এবং একক লেনদেন নির্ভর কাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহী।
মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর ঐক্যের বার্তা
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেকে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিয়ম ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা দুর্বল হলেও এই দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে মার্কিন আধিপত্যের শিকার হওয়া এড়ানো সম্ভব। তার বক্তব্য, যখন নিয়ম আর সুরক্ষা দেয় না, তখন নিজেদেরই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়।
এই অবস্থানের পরই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার সফর শেষে কানাডার ওপর নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি আসে। তবু কানাডা একা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নিজেদের বাণিজ্যিক শক্তি প্রদর্শনের পর বিশ্বজুড়ে নতুন চুক্তির পথে এগোচ্ছে।
ইউরোপ, ভারত ও এশিয়ার নতুন সমীকরণ

দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর দক্ষিণ আমেরিকার মার্কোসুর জোটের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনাও শেষ পর্যায়ে, যেখানে ইউরোপীয় গাড়ি ও ভারতীয় ইস্পাতের ওপর শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে ইউরোপ। ভিয়েতনাম ও তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ায় ভারত গত বছর যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। আগামী মার্চে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে জ্বালানি, খনিজ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিহীন নতুন কাঠামোর ভাবনা
বিশ্ব কূটনীতিতে এখন ‘ঝুঁকি কমানো’ শব্দটি নতুন অর্থ পাচ্ছে। আগে এটি চীনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি ছেড়ে যেতে চায় না, বরং নিজেদের মধ্যে ইচ্ছুক জোট গড়ে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে চায়।

একসময় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিচারিক কাঠামো অচল হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া সাতচল্লিশটি দেশ বিকল্প নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রপ্তানির তুলনামূলক কম অংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও, তাকে বাদ দিয়ে গঠিত নতুন জোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভাজন কৌশল কার্যকর নাও হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজারের সামনে কী
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, গত বছরের বাণিজ্য অস্থিরতার পরও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার চিহ্ন স্পষ্ট নয়। তবে এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে পারে এবং তা বুঝতে সময় লাগবে। বিশেষ করে সীমান্ত পারের বিনিয়োগ, বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহ ও ডলারের ভূমিকা নতুন করে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ এবং দুর্বল ডলারের আকাঙ্ক্ষা বিশ্ব বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও, ওয়াল স্ট্রিটের জন্য ভবিষ্যৎ চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















