০৪:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
দুই দশকের অপেক্ষার অবসান: ভারত–ইউরোপের ‘সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি’ চূড়ান্ত গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে ভাঙন, ন্যাটোর মূল্যবোধে সরাসরি আঘাত ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা ট্রাম্প থেকে দূরে, জাতীয় সার্বভৌমত্বের চাপ বাড়ায় অস্বস্তি ইরানে নীরবতার মূল্য কত প্রাণ ইমিগ্রেশন অভিযানে আস্থা সংকট: মিনিয়াপলিসের রক্তপাত ঘিরে ভেতর থেকেই প্রশ্ন ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল আমেরিকার বিভক্ত বাস্তবতা, মিনিয়াপলিসের রক্তাক্ত সপ্তাহান্ত চীনে শীর্ষ সেনা নেতার পতন: শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ ‘প্রিন্সলিং’-এর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান হোয়াটসঅ্যাপের নতুন কড়া নিরাপত্তা মোড, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ দিল্লিতে বৃষ্টিতে তাপমাত্রা হুড়মুড় করে কমল, কিন্তু বাতাসের দম বন্ধই রইল চীনা পর্যটক কমলেও স্বস্তিতে জাপান, ব্যবসায় বড় ধাক্কার আশঙ্কা কম

কেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ট্রাম্পের ধাক্কাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই

  • এলিনা নূর
  • ০৩:২৩:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • 19

প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতা গ্রহণের সময় ওয়াশিংটনের ক্যাপিটলে তার অভিষেক ভাষণ দেন। সে সময় তার বক্তব্যের বড় অংশই অনেকের কাছে চেনা অতিশয়োক্তি বলে মনে হয়েছিল। কারণ বিশ্ব তার আগের চার বছরের শাসনকাল প্রত্যক্ষ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে অক্ষতই ছিল।

Opinion | How China's pragmatic balancing puts it in Asean pole position |  South China Morning Post

এমনকি ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও একটি “বর্ধনশীল জাতি” হিসেবে ভাবতে বলেন, যে দেশ তার সম্পদ বাড়াবে, ভূখণ্ড বিস্তার করবে এবং নতুন ও সুন্দর দিগন্তে নিজের পতাকা বহন করবে, তখনও আন্তর্জাতিক সমাজ এটিকে মূলত রূপক হিসেবেই দেখেছিল। ‘পরবর্তী মহান অভিযানের আহ্বান’ যে বাস্তবে রূপ নিতে পারে, তা খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিল।

কিন্তু হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার এক বছরের মধ্যেই ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, তিনি তার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি “উচ্চাকাঙ্ক্ষী” করে তোলার পথে প্রথমে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর বিশ্বের নানা দেশে ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ, ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরের জলসীমায় নৌযানের ওপর একতরফা ড্রোন হামলা, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ও দেশটির তেল সম্পদ দখল, এমনকি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রতি একগুঁয়ে আগ্রহ—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

Trump Is Back: What Can ASEAN and the Criminals in Naypyitaw Expect?

এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে কয়েক শতাব্দী আগের সাম্রাজ্যবাদী যুগ আসলে কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্রাজ্য আবারও প্রকাশ্যভাবে ফিরে এসেছে। হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে বলেছেন—এমন এক বিশ্ব, যেখানে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতাই একমাত্র অটল আইন।

এই প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শন, এমনকি মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধেও, ওয়াশিংটনের জন্য বড় অংশে ফলপ্রসূ হয়েছে। সোনার উপহার, অলংকৃত সম্মাননা, এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক পর্যন্ত উপঢৌকন হিসেবে এসেছে। বহু দেশ ও প্রতিষ্ঠান ওভাল অফিসের কৃপা পেতে নতজানু হয়েছে, কিংবা অন্তত তার ঘুরে বেড়ানো নিশানা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ পরীক্ষার প্রতি সহনশীলতা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে, যদিও দেশগুলো বুঝতে পারছিল যে এসব ধাক্কা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে আরও নেতিবাচক দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন নেতারা একের পর এক যুক্তি দাঁড় করাতে চেয়েছেন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার ঘটনাকে বৈধ প্রমাণ করতে। মনে হচ্ছিল, সবকিছুই আলোচনার বিষয়—যতক্ষণ না সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের আশঙ্কা উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের একেবারে কাছে এসে পড়ে।

এর ফল হয় অকল্পনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড রক্ষায় ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন করা হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন সেই সত্য, যা বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠ বহুদিন ধরেই অভিজ্ঞতা থেকে বলে আসছে—নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত ক্ষমতাবানদের সুবিধার জন্য তৈরি এক কার্যকর কল্পকাহিনি।

কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি যে শুরু থেকেই অসমতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে স্পষ্ট হয়েছে তখনই, যখন তাদের নিজেদের মিত্রের বন্দুকের নল তাদের দিকেই ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু বিশ্বের বড় অংশ বহুদিন ধরেই মহাশক্তির খামখেয়ালিপনা ও আন্তর্জাতিক আইনের বাছাই করা প্রয়োগের শিকার। এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, লাতিন আমেরিকা ও ওশেনিয়ার ইতিহাস ও ভূগোল হস্তক্ষেপের কবরস্থানে ভরা হলেও, এসব অঞ্চল আজও প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার খেলায় নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চলের জন্য কি কোনো ‘গ্রিনল্যান্ড মুহূর্ত’ অপেক্ষা করছে। অতীতের সেই ব্যবস্থা, যেখানে ডাচ ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো বাণিজ্যিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল এবং যা ইউরোপীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করেছিল, তার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায়। আজকের দিনে তা প্রতিফলিত হচ্ছে বিশাল আকারের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে, যেগুলো অতীতের শিক্ষা উপেক্ষা করেই উদযাপিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে ডিজিটাল ও সবুজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট, যেগুলোর ওপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভবিষ্যৎ অর্থনীতির আশায় বাজি ধরছে। কঠিন বাস্তবতা হলো, এই রূপান্তরগুলোর পেছনেও একই পুরোনো ঔপনিবেশিক চর্চা কাজ করছে—সম্পদ আহরণ, শ্রম শোষণ ও ভূমি দখল—যা এখন আধুনিক উন্নয়নের নামে নতুন মোড়কে উপস্থাপিত হচ্ছে।

Southeast Asia prepares for Trump's tariff threats - MarketExpress

এমন প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উদ্ধার বা পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা অর্থহীন। বরং এই ভাঙন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে নতুনভাবে বৈশ্বিক ব্যবস্থা লেখার; এমন এক ব্যবস্থা, যা অন্তত পুরোনো ব্যবস্থার কারসাজিমূলক ও নিয়ন্ত্রণমূলক গতিপথকে ব্যাহত করবে।

তবু বর্তমান ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার আকর্ষণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এখনো প্রবল। গাজার জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ড’-এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো নব্য-ঔপনিবেশিক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সব বৈশিষ্ট্যই বহন করে, যেখানে প্রশাসন কার্যত অর্থের বিনিময়ে প্রভাব কেনাবেচার মতো হয়ে উঠছে।

এই বোর্ডকে একটি বিশেষাধিকারভিত্তিক সদস্যপদের প্রস্তাব হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে এটি এমন এক কাঠামো, যা গাজা পুনর্গঠনের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিজেই দাবি করছে, অথচ ধ্বংসের দায়দায়িত্বের কোনো জবাবদিহি নেয় না। বোর্ডের কয়েকজন সদস্য আবার গত দুই বছরে গাজা ধ্বংসের ক্ষেত্রে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ এমন একটি বোর্ডে যোগ দিতে তাড়াহুড়া না করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের উচিত নিজেদের খুব দূরের নয় এমন ঔপনিবেশিক অতীত স্মরণ করা এবং ভাবা—তারা ইতিহাসের কোন পাশে দাঁড়াতে চান। আধুনিক ও স্বাধীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রের মানদণ্ড হওয়া উচিত নয় সে কত দক্ষতার সঙ্গে অধীনতাকে অনুকরণ বা উন্নয়ন হিসেবে আড়াল করতে পারে; বরং তার মানদণ্ড হওয়া উচিত একটি ভিন্ন, আরও ন্যায্য ব্যবস্থাকে কল্পনা করা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা।

মার্কিন নেতৃত্বে বিশ্বব্যবস্থার দিন শেষ: কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমাজে প্রকৃত পরিবর্তনের চাপ আসবে সাধারণ মানুষের দিক থেকেই। ভ্যাক্লাভ হাভেল, যার কথা মার্ক কার্নি দাভোসে তার ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন, লিখেছিলেন ক্ষমতাহীন মানুষের শক্তির কথা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রেক্ষাপটে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় মালয়েশীয় চিন্তাবিদ সৈয়দ হুসেইন আলাতাসের সতর্কবার্তা—‘আবদ্ধ মন’-এর বিপদ, যা অন্ধ অনুকরণে ও সমালোচনাহীনভাবে পশ্চিমা চিন্তার অধীন হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন অপরিহার্য। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ ও রাষ্ট্রগুলো কি নিজেদের গল্প নিজেরাই লেখার সাহস দেখাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুই দশকের অপেক্ষার অবসান: ভারত–ইউরোপের ‘সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি’ চূড়ান্ত

কেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ট্রাম্পের ধাক্কাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই

০৩:২৩:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতা গ্রহণের সময় ওয়াশিংটনের ক্যাপিটলে তার অভিষেক ভাষণ দেন। সে সময় তার বক্তব্যের বড় অংশই অনেকের কাছে চেনা অতিশয়োক্তি বলে মনে হয়েছিল। কারণ বিশ্ব তার আগের চার বছরের শাসনকাল প্রত্যক্ষ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে অক্ষতই ছিল।

Opinion | How China's pragmatic balancing puts it in Asean pole position |  South China Morning Post

এমনকি ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও একটি “বর্ধনশীল জাতি” হিসেবে ভাবতে বলেন, যে দেশ তার সম্পদ বাড়াবে, ভূখণ্ড বিস্তার করবে এবং নতুন ও সুন্দর দিগন্তে নিজের পতাকা বহন করবে, তখনও আন্তর্জাতিক সমাজ এটিকে মূলত রূপক হিসেবেই দেখেছিল। ‘পরবর্তী মহান অভিযানের আহ্বান’ যে বাস্তবে রূপ নিতে পারে, তা খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিল।

কিন্তু হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার এক বছরের মধ্যেই ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, তিনি তার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি “উচ্চাকাঙ্ক্ষী” করে তোলার পথে প্রথমে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর বিশ্বের নানা দেশে ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ, ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরের জলসীমায় নৌযানের ওপর একতরফা ড্রোন হামলা, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ও দেশটির তেল সম্পদ দখল, এমনকি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রতি একগুঁয়ে আগ্রহ—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

Trump Is Back: What Can ASEAN and the Criminals in Naypyitaw Expect?

এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে কয়েক শতাব্দী আগের সাম্রাজ্যবাদী যুগ আসলে কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্রাজ্য আবারও প্রকাশ্যভাবে ফিরে এসেছে। হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে বলেছেন—এমন এক বিশ্ব, যেখানে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতাই একমাত্র অটল আইন।

এই প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শন, এমনকি মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধেও, ওয়াশিংটনের জন্য বড় অংশে ফলপ্রসূ হয়েছে। সোনার উপহার, অলংকৃত সম্মাননা, এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক পর্যন্ত উপঢৌকন হিসেবে এসেছে। বহু দেশ ও প্রতিষ্ঠান ওভাল অফিসের কৃপা পেতে নতজানু হয়েছে, কিংবা অন্তত তার ঘুরে বেড়ানো নিশানা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ পরীক্ষার প্রতি সহনশীলতা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে, যদিও দেশগুলো বুঝতে পারছিল যে এসব ধাক্কা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে আরও নেতিবাচক দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন নেতারা একের পর এক যুক্তি দাঁড় করাতে চেয়েছেন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার ঘটনাকে বৈধ প্রমাণ করতে। মনে হচ্ছিল, সবকিছুই আলোচনার বিষয়—যতক্ষণ না সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের আশঙ্কা উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের একেবারে কাছে এসে পড়ে।

এর ফল হয় অকল্পনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড রক্ষায় ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন করা হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন সেই সত্য, যা বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠ বহুদিন ধরেই অভিজ্ঞতা থেকে বলে আসছে—নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত ক্ষমতাবানদের সুবিধার জন্য তৈরি এক কার্যকর কল্পকাহিনি।

কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি যে শুরু থেকেই অসমতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে স্পষ্ট হয়েছে তখনই, যখন তাদের নিজেদের মিত্রের বন্দুকের নল তাদের দিকেই ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু বিশ্বের বড় অংশ বহুদিন ধরেই মহাশক্তির খামখেয়ালিপনা ও আন্তর্জাতিক আইনের বাছাই করা প্রয়োগের শিকার। এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, লাতিন আমেরিকা ও ওশেনিয়ার ইতিহাস ও ভূগোল হস্তক্ষেপের কবরস্থানে ভরা হলেও, এসব অঞ্চল আজও প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার খেলায় নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চলের জন্য কি কোনো ‘গ্রিনল্যান্ড মুহূর্ত’ অপেক্ষা করছে। অতীতের সেই ব্যবস্থা, যেখানে ডাচ ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো বাণিজ্যিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল এবং যা ইউরোপীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করেছিল, তার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায়। আজকের দিনে তা প্রতিফলিত হচ্ছে বিশাল আকারের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে, যেগুলো অতীতের শিক্ষা উপেক্ষা করেই উদযাপিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে ডিজিটাল ও সবুজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট, যেগুলোর ওপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভবিষ্যৎ অর্থনীতির আশায় বাজি ধরছে। কঠিন বাস্তবতা হলো, এই রূপান্তরগুলোর পেছনেও একই পুরোনো ঔপনিবেশিক চর্চা কাজ করছে—সম্পদ আহরণ, শ্রম শোষণ ও ভূমি দখল—যা এখন আধুনিক উন্নয়নের নামে নতুন মোড়কে উপস্থাপিত হচ্ছে।

Southeast Asia prepares for Trump's tariff threats - MarketExpress

এমন প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উদ্ধার বা পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা অর্থহীন। বরং এই ভাঙন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে নতুনভাবে বৈশ্বিক ব্যবস্থা লেখার; এমন এক ব্যবস্থা, যা অন্তত পুরোনো ব্যবস্থার কারসাজিমূলক ও নিয়ন্ত্রণমূলক গতিপথকে ব্যাহত করবে।

তবু বর্তমান ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার আকর্ষণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এখনো প্রবল। গাজার জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ড’-এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো নব্য-ঔপনিবেশিক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সব বৈশিষ্ট্যই বহন করে, যেখানে প্রশাসন কার্যত অর্থের বিনিময়ে প্রভাব কেনাবেচার মতো হয়ে উঠছে।

এই বোর্ডকে একটি বিশেষাধিকারভিত্তিক সদস্যপদের প্রস্তাব হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে এটি এমন এক কাঠামো, যা গাজা পুনর্গঠনের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিজেই দাবি করছে, অথচ ধ্বংসের দায়দায়িত্বের কোনো জবাবদিহি নেয় না। বোর্ডের কয়েকজন সদস্য আবার গত দুই বছরে গাজা ধ্বংসের ক্ষেত্রে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ এমন একটি বোর্ডে যোগ দিতে তাড়াহুড়া না করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের উচিত নিজেদের খুব দূরের নয় এমন ঔপনিবেশিক অতীত স্মরণ করা এবং ভাবা—তারা ইতিহাসের কোন পাশে দাঁড়াতে চান। আধুনিক ও স্বাধীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রের মানদণ্ড হওয়া উচিত নয় সে কত দক্ষতার সঙ্গে অধীনতাকে অনুকরণ বা উন্নয়ন হিসেবে আড়াল করতে পারে; বরং তার মানদণ্ড হওয়া উচিত একটি ভিন্ন, আরও ন্যায্য ব্যবস্থাকে কল্পনা করা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা।

মার্কিন নেতৃত্বে বিশ্বব্যবস্থার দিন শেষ: কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমাজে প্রকৃত পরিবর্তনের চাপ আসবে সাধারণ মানুষের দিক থেকেই। ভ্যাক্লাভ হাভেল, যার কথা মার্ক কার্নি দাভোসে তার ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন, লিখেছিলেন ক্ষমতাহীন মানুষের শক্তির কথা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রেক্ষাপটে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় মালয়েশীয় চিন্তাবিদ সৈয়দ হুসেইন আলাতাসের সতর্কবার্তা—‘আবদ্ধ মন’-এর বিপদ, যা অন্ধ অনুকরণে ও সমালোচনাহীনভাবে পশ্চিমা চিন্তার অধীন হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন অপরিহার্য। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ ও রাষ্ট্রগুলো কি নিজেদের গল্প নিজেরাই লেখার সাহস দেখাবে।