শীত এলেই যুদ্ধের গতি কমে যাবে—এ ধারণা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে আর সত্য নেই। তীব্র ঠান্ডা, তুষারপাত কিংবা কাদামাখা ভূমি, কিছুই এখন আর লড়াই থামাতে পারছে না। আকাশে সর্বক্ষণ নজরদারি চালানো ড্রোনের কারণে শীতকালও পরিণত হয়েছে সমান ভয়ংকর এক যুদ্ধমৌসুমে।
খারকিভ অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা
২০২২ সালে যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেনে ট্যাংক ও ভারী সাঁজোয়া যানই ছিল প্রধান শক্তি। শীতে জমে যাওয়া মাটিতে সেগুলো চলতে পারলেও সামগ্রিক লড়াই তখন ধীর হয়ে যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন ড্রোনই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু। খারকিভ অঞ্চলে এক শীতের সকালে হাঁটুসমান বরফ ভেঙে এগোতে থাকা দুই রুশ সেনাকে ড্রোনের ক্যামেরায় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছিল ইউক্রেনীয় বাহিনী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই দৃশ্য পরিণত হয় প্রাণঘাতী আঘাতে।

ড্রোনযুদ্ধে বদলে যাওয়া কৌশল
আকাশে সর্বব্যাপী ড্রোনের উপস্থিতিতে ভারী অস্ত্র চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে সব ঋতুতেই। তাই রুশ বাহিনী এখন ছোট ছোট দল পাঠাচ্ছে, কখনও মোটরসাইকেলে, কখনও পায়ে হেঁটে, যাতে ড্রোনের চোখ এড়িয়ে ইউক্রেনীয় অবস্থানে ঢোকা যায়। ইউক্রেনীয় সেনাদের ভাষায়, গ্রীষ্ম বা শীত, কৌশলের তেমন পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু ঠান্ডার যন্ত্রণা।

শীতের আবহাওয়া, সুবিধা আর ঝুঁকি
শীতকাল ড্রোনযুদ্ধে দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। গাছের পাতা ঝরে যাওয়ায় সেনারা সহজেই ধরা পড়ে যায়। তুষারের ওপর পায়ের ছাপ আকাশ থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। ঠান্ডায় ড্রোনের তাপীয় ক্যামেরা আরও কার্যকর হয়। আবার ভারী তুষারপাত বা ঘন কুয়াশা নামলে দৃশ্যমানতা কমে যায়, যা ড্রোন পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়।

ঠান্ডা, প্রযুক্তি আর মানবিক সীমাবদ্ধতা
চরম ঠান্ডা যেমন সৈন্যদের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তেমনি ড্রোনের ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশেও প্রভাব ফেলে। অনেক সময় প্রপেলারে বরফ জমে যায়। এ সমস্যা সামলাতে কেউ চুলার পাশে ড্রোন গরম করছে, কেউ ব্যয়বহুল স্প্রে ব্যবহার করছে, আবার কোথাও সাধারণ পশুচর্বি মাখিয়েই কার্যকর সমাধান মিলছে।
আহত উদ্ধার আর বাঙ্কারের বাস্তবতা
তুষারপাতের কারণে আহতদের দ্রুত সরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে চিকিৎসা দেরিতে পৌঁছাচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। একই সঙ্গে ড্রোনের হুমকিতে বাঙ্কার আরও গভীর করে খনন করতে হচ্ছে, যা জমাট মাটিতে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই সৈন্যদের অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ বাঙ্কারে স্থির থাকতে হচ্ছে, জীবন বাঁচানোর জন্য।

শেষ পর্যন্ত মানুষই ভরসা
ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখলেও, সেনারা বলছেন মানবিক উপস্থিতি অপরিহার্য। খারাপ আবহাওয়ায় ড্রোন নামতে বাধ্য হলে শেষ ভরসা থাকে পদাতিক বাহিনীই। বিশ্লেষকদের মতে, শীত সাধারণত প্রতিরক্ষাকারীদের পক্ষে যায়। ইউক্রেনীয় সেনাদের বিশ্বাস, এই শীত টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় লড়াই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















