হিমালয়জুড়ে টানা ৪৮ ঘণ্টার আকস্মিক ও ভারী তুষারপাত পাহাড়ি জনজীবনকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও কাশ্মীরের একাধিক উচ্চাঞ্চলে সড়ক বন্ধ, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং পর্যটকসহ অসংখ্য মানুষ আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।
হিমাচল প্রদেশে সংকট
হিমাচল প্রদেশে এই তুষারপাত দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়ার অবসান ঘটালেও কুল্লু-মানালি অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী শনিবার পর্যন্ত রাজ্যের ৬৮৩টি সড়ক বন্ধ হয়ে যায়, যার মধ্যে দুটি জাতীয় সড়কও রয়েছে। শুধু কুল্লু জেলাতেই ৭৯টি সড়ক বন্ধ এবং ৫৮৭টি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়ে।
মানালিতে তুষার দেখার জন্য পর্যটকদের ভিড়ের কারণে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বহু মানুষ বাধ্য হয়ে গাড়ি ফেলে হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বরফে ঢাকা পথে গাড়ি আটকে যাচ্ছে কিংবা পিছলে পড়ছে। দিল্লি থেকে আসা পর্যটক অক্ষয় জানান, তিন ঘণ্টার বেশি সময় যানজটে আটকে থাকার পর প্রায় সাত কিলোমিটার হেঁটে মানালিতে পৌঁছাতে হয়েছে। আরেক পর্যটক তৃষা বলেন, তাদের সারা রাত গাড়ির মধ্যেই কাটাতে হয়েছে এবং সঙ্গে থাকা সামান্য খাবারেই রাত পার করতে হয়েছে।
অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ
আটকে পড়া পর্যটকদের একাংশ ট্যাক্সিচালকদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন। তুষারপাতের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মাত্র ২০ কিলোমিটার পথের জন্য কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
উদ্ধার ও সড়ক পরিষ্কার কাজ
আবহাওয়া কিছুটা অনুকূল হওয়ায় শনিবার থেকে তুষার পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরোপুরি বরফ সরানো না হলে মানালির দিকে যান চলাচল চালু করা হবে না। আটাল টানেল হয়ে মানালি-লাহুল সড়ক সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এদিকে রঘুপূর দুর্গের কাছে তুষারে আটকে পড়া ১২ জন পর্যটককে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে।
উত্তরাখণ্ডে বিপর্যয়
উত্তরাখণ্ডে শুক্রবার থেকে মাঝারি থেকে ভারী তুষারপাত জনজীবনে বড় ধাক্কা দেয়। বিশেষ করে উত্তরকাশী জেলায় তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বরফে ঢাকা সড়কে আটকে পড়েন। যমুনোত্রী মহাসড়কের জারমোলা ধার এলাকা থেকে প্রায় ৫০টি গাড়িতে থাকা ২০০ জনকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত দলগুলো তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। নৈনিতাল ও তেহরি গাড়োয়ালেও রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরানো হয়েছে।
মুসৌরিতে পর্যটকের ভিড়
প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটিকে কেন্দ্র করে মুসৌরিতে পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রয়োজনে একমুখী যান চলাচল ব্যবস্থা চালু করা হবে।

কাশ্মীরে ভারী তুষার ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়
কাশ্মীর উপত্যকায় ভারী তুষারপাতের কারণে গুলমার্গ ও তাংমার্গ এলাকা থেকে ১৬০০-এর বেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। গুলমার্গে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার তুষার জমেছে, উঁচু এলাকায় যার পরিমাণ চার ফুট পর্যন্ত। বরফে ঢাকা পিচ্ছিল রাস্তায় চার চাকার বিশেষ গাড়ির মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করে পুলিশ। একই সঙ্গে তুষারপাতের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন এক ধাক্কায় ব্যাপকভাবে কমে গেলেও শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে অধিকাংশ সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।

পর্যটনে আশীর্বাদ, তবে সতর্কতা জারি
গুলমার্গ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান জানান, নিয়ম মেনেই কাজ চলছে এবং সময়মতো এই তুষারপাত পর্যটনের জন্য ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে। তবে আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে নতুন করে বৃষ্টি ও তুষারপাতের পূর্বাভাস থাকায় তিন রাজ্যেই প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















