গাজার বন্যাকবলিত বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ইঁদুর। নোংরা পানি, উপচে পড়া পয়োনিষ্কাশন, জমে থাকা আবর্জনা আর গাদাগাদি করে বসবাস—সব মিলিয়ে শীতের বৃষ্টিতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবার এখন ইঁদুরবাহিত রোগের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
পয়োনিষ্কাশন ধ্বংস, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি
সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধের সময় গাজার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। অনেক এলাকায় নর্দমার পানি রাস্তায় ও তাঁবুর মাঝখানে জমে থাকছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি ইঁদুরের বংশবিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকিতে পরিণত করছে।
গ্রামীণ বাস্তুচ্যুত এলাকা আল-মাওয়াসিতে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে আদিম পদ্ধতিতে মলমূত্র নিষ্কাশন করছে। এতে দূষিত পানি ও বর্জ্যের সংস্পর্শ আরও বেড়েছে, ফলে ইঁদুর ও জীবাণুর বিস্তার দ্রুত হচ্ছে।
লেপ্টোস্পাইরোসিসের আশঙ্কা
এই পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যে লেপ্টোস্পাইরোসিস নামের একটি মারাত্মক রোগের সন্দেহজনক কয়েকটি ঘটনা দেখা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর খান ইউনিস ও গাজা সিটিতে অন্তত তিনটি সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়। এই রোগটি সাধারণত ইঁদুরের মূত্রে দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং ভারী বৃষ্টির পর মহামারি আকার নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রে বোর্ড-স্বীকৃত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হামদান আবদুল্লাহ হামেদ বলেন, বন্যা ও অতিরিক্ত ভিড় মানুষকে দীর্ঘ সময় দূষিত পানি ও প্রাণীর সংস্পর্শে থাকতে বাধ্য করছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাঁর মতে, ত্বকে সামান্য ক্ষত বা অদৃশ্য ফাটল থাকলেও এই রোগ শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
তিনি জানান, এই রোগের কোনো মানব টিকা নেই, তবে দ্রুত শনাক্ত হলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা সম্ভব। সীমিত অবস্থায়ও কিছু সতর্কতা ঝুঁকি কমাতে পারে। যেমন, পা ঢাকা জুতা পরা, লম্বা হাতা জামা ও পূর্ণ দৈর্ঘ্যের প্যান্ট ব্যবহার এবং ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা।

শীত, বন্যা ও বাস্তুচ্যুতি মিলিয়ে স্বাস্থ্যসংকট
ইঁদুরের এই বিস্তার ঘটছে প্রায় পুরো গাজার জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুত অবস্থার মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, এক মিলিয়নের বেশি মানুষ জরুরি আশ্রয়ের সহায়তা চায়। শীতের বৃষ্টিতে শিবিরগুলো জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, অনেক অস্থায়ী কাঠামো ধসে পড়ছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঝড়-সংক্রান্ত ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি শিশু হাইপোথার্মিয়ায় মারা গেছে, আর ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছে ভেঙে পড়া কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে।
শ্বাসতন্ত্র ও ডায়রিয়ার প্রকোপ
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যা, অপুষ্টি, অতিরিক্ত ভিড় ও চিকিৎসা সেবার সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শীতকাল এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজায় সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও তীব্র পানিজনিত ডায়রিয়া। ডিসেম্বর মাসেই এসব রোগের ৮৮ হাজারের বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

শিশুদের টিকাদানে বড় ঘাটতি
ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি সতর্ক করে বলেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় টিকাদানে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা এখন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কীটনাশকের সংকট
জাতিসংঘের মানবিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকট, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও চলাচলে বাধার কারণে বর্জ্য সংগ্রহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত। আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে স্তূপ করে থাকা আবর্জনা ইঁদুর বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কীটনাশক ও ইঁদুরনাশক ঢুকতে না দেওয়ায় নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কার্যত অচল।

স্বাস্থ্য নজরদারি চালু, তবে সীমাবদ্ধতা বড়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগ শনাক্ত ও নজরদারি জোরদারের চেষ্টা করছে। গাজার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার পুনর্বাসন এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ না ঢুকতে দেওয়ায় শনাক্তকরণ এখনো সীমিত।
সহায়তা সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা
পয়োনিষ্কাশন ভেঙে পড়া, কীটনাশক আটকে থাকা এবং ঠান্ডা ও দূষিত পরিবেশে বসবাস—এই সবকিছু মিলিয়ে গাজায় ইঁদুরবাহিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার ও সম্পদ নিশ্চিত করা গেলে এই বিপদের বড় অংশই এখনও প্রতিরোধযোগ্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















