দাভোসে এ বছর একটি পরিচিত কিন্তু গভীর সতর্কবার্তা আবারও প্রতিধ্বনিত হয়েছে—বিশ্বব্যবস্থা ক্রমশ বন্ধ চক্রে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে ‘ঝুঁকি হ্রাস’ এখনো প্রধান শব্দবন্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কৌশলগত উঁচু দেয়ালে ঘেরা এক কাঠামো হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এই দেয়ালের বাইরে, গ্লোবাল সাউথে আরও বাস্তব ও গভীর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। অবকাঠামো ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে, কেবল এশিয়াতেই যার বার্ষিক পরিমাণ আনুমানিক ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার একটি সংকট। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কোলাহলের আড়ালে একটি আরও গঠনমূলক বয়ান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। নাইজেরিয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত টিকা সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রযুক্তি থেকে শুরু করে মিসরে ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার উত্থান—চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমন এক সরবরাহমুখী সমাধান হয়ে উঠছে, যা গভীর শাসনঘাটতিতে ভোগা বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিবর্তন বৈশ্বিক জনসেবা সরবরাহের ধারণাতেও এক বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—‘মাছ দেওয়া’ থেকে ‘মাছ ধরতে শেখানো’র দিকে অগ্রসর হওয়া।
শূন্য-সম মানসিকতা থেকে সরে আসা

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বয়ান একটি শূন্য-সম মানসিকতায় আটকে ছিল—ধারণা ছিল, একটি দেশের উত্থান মানেই আরেকটির পতন। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই বেইজিংয়ের ‘সমবায় ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ ধারণাকে ঐতিহ্যগত আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে। অথচ চীনের দৃষ্টিভঙ্গি তার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ভূখণ্ড সম্প্রসারণের চেয়ে বাণিজ্যভিত্তিক সংযোগ ও উন্নয়নগত স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর ঐচ্ছিক নয়; এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থাগত স্থিতির ভিত্তি।
সবুজ রূপান্তর ও শক্তির সংকট
এই পরিবর্তনের প্রমাণ স্পষ্ট। ২০২৬ সালে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ‘ইলেকট্রন ঘাটতি’ বৈশ্বিক আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। শক্তিখেকো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লব এবং সবুজ রূপান্তরের জরুরি চাহিদার মধ্যে এক ঐতিহাসিক সংঘর্ষ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। বহু দেশের জন্য স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের অভাবই দারিদ্র্যের আধুনিক রূপ।
এখানেই চীনের শিল্পভিত্তিক পরিসর—যার ভিত্তি ২০২৩ সালে প্রায় ৮৯০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগ—কার্যত গ্রহের জন্য একটি ‘সবুজ ভর্তুকি’ হিসেবে কাজ করছে। সৌর ও বায়ু শক্তির খরচ কমিয়ে চীন পুরো গ্লোবাল সাউথের জন্য প্রবেশের বাধা নামিয়ে এনেছে। এর ফলে স্বল্প আয়ের দেশগুলো এমন জলবায়ু ও ডিজিটাল লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে, যা আগে আর্থিকভাবে অসম্ভব ছিল।

উদ্ভাবনের প্রাথমিক অস্থির ব্যয় নিজের কাঁধে নিয়ে চীন এমন এক সমষ্টিগত সমস্যার সমাধান করছে, যা অন্য কোনো শক্তি একা অর্থায়নে এগিয়ে আসেনি। এই মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ফলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আর কেবল গ্লোবাল নর্থের বিলাসিতা নয়; এটি গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান মধ্যবিত্তের জন্যও একটি মৌলিক সেবায় পরিণত হয়েছে। এটিই বৈশ্বিক জনসেবার মূল সত্তা।
স্বাস্থ্যখাতে কাঠামোগত পরিবর্তন
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ২০২০-এর দশকের শুরুতে টিকা বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যেখানে গ্লোবাল সাউথ উত্তরাঞ্চলের অবশিষ্টাংশের অপেক্ষায় ছিল। আজ আমরা একটি কাঠামোগত রূপান্তর দেখছি।
চীনের ভূমিকা সংকটকালীন সরবরাহকারী থেকে স্থানীয় ওষুধ উৎপাদন ব্যবস্থার অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো ও মিসরের কৌশলগত কেন্দ্রগুলো প্রকৃত স্বাস্থ্যস্বাধীনতার দিকে এক মোড় ঘোরাচ্ছে। চীন কেবল টিকা পাঠাচ্ছে না; তারা এমআরএনএ ও জৈব উৎপাদনের দক্ষতা হস্তান্তর করছে, যাতে এসব দেশ নিজস্ব কারখানা গড়ে তুলতে পারে।
প্রচলিত দানভিত্তিক মডেলের বিপরীতে, যা দাতার মনোযোগ সরে গেলে ভেঙে পড়ত, এসব কেন্দ্র স্বাগতিক দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এতে উচ্চপ্রযুক্তির কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদার হয়। দেশগুলোকে নিজস্ব জরুরি ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম করে চীন পুরোনো নির্ভরতার কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ সংকটে অতীতের বৈষম্য পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

অবকাঠামোতে নতুন মডেল
সবচেয়ে বড় বিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে অবকাঠামো খাতে। ঋণের স্বচ্ছতা ও প্রকল্পের মান নিয়ে উদ্বেগকে উচ্চমানের উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে স্বাগত জানানো উচিত। তানজানিয়া ও জাম্বিয়ার মধ্যে তাজারা রেলপথের পুনরুজ্জীবন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
১৯৭০-এর দশকের সহায়তার স্থির প্রতীক হিসেবে নয়, নতুন ৩০ বছরের ছাড়পত্রের আওতায় এই রেলপথ এখন এক ব্যাপক ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাজারা মডেলটি ‘মাছ ধরতে শেখানো’র চূড়ান্ত কৌশল। সাধারণ নির্মাণ ও হস্তান্তর পদ্ধতির বদলে এটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, যেখানে স্বাগতিক দেশ কেবল অবকাঠামো নয়, পরিচালন দক্ষতাও অর্জন করে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় আন্তর্জাতিক হিসাবমান ও তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা ‘ঋণফাঁদ’ বয়ানের শক্ত প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করছে। টেকসই ব্যবসায়িক সম্পদ হিসেবে প্রকল্প পরিচালিত হলে সেগুলো ঋণযোগ্যতার ইঞ্জিনে পরিণত হয়। স্মার্ট লজিস্টিকস ও তাৎক্ষণিক নজরদারির মতো প্রযুক্তি ‘ডিজিটাল সিল্ক রোড’-এর একটি ছক দিতে পারে, যা কাঁচা ইস্পাতের বাইরে গিয়ে উন্নত বাণিজ্য সফটওয়্যারে চীনের অবদানকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যায়।

সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
২০২৬ সালের নির্ধারক চ্যালেঞ্জ হলো সমষ্টিগত উদ্যোগের ক্ষয়। কিছু শক্তি যখন বৈশ্বিক অঙ্গীকার থেকে কৌশলগতভাবে সরে যাচ্ছে, তখন বাস্তব উপযোগিতাভিত্তিক বহুপাক্ষিকতাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
এতে চীন ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সমন্বিত ক্ষেত্র তৈরি হয়। চীন যদি উন্নয়নের উচ্চপ্রযুক্তি ও স্বল্পমূল্যের ভৌত অবকাঠামো সরবরাহ করে—রেলপথ বা সৌর গ্রিড—আর বহুপাক্ষিক ব্যাংকগুলো যদি নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধান দেয়, তবে গ্লোবাল সাউথই লাভবান হয়। এই সমন্বয় নিশ্চিত করে যে বৈশ্বিক জনসেবা কোনো একক মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পদ না হয়ে দৃঢ় অংশীদারিত্বের জালে পৌঁছে যায়।
আমাদের ‘আমরা বনাম তারা’ বাগ্মিতার বাইরে যেতে হবে। জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে প্রচেষ্টা পুনঃস্থাপন করলে চীনের অবদান নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক সাধারণ সম্পদে রূপ নেবে। তখনই ‘সমবায় ভবিষ্যৎ’ একটি কার্যকর বাস্তবতায় পরিণত হবে—এমন এক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে সমৃদ্ধি মানবতার যৌথ উত্তরাধিকার, ভূরাজনৈতিক বর্জনের হাতিয়ার নয়।
জিয়াং জিয়ানি 



















