বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে জোটের চেহারা। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কেন্দ্রিক হুমকি ও অনিশ্চিত নীতির প্রেক্ষাপটে ইউরোপ, কানাডা, ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্য নতুন করে ভারতের দিকে ঝুঁকছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি কমানো ও বিকল্প বাজার গড়াই এখন প্রধান লক্ষ্য।
ট্রাম্পের হুমকিতে বাণিজ্য পুনর্বিন্যাস
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নতুন সমীকরণের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাবাদী অবস্থান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে শুল্ক আরোপ ও কড়া বাণিজ্যনীতির আশঙ্কায় বহু দেশ নিজেদের রপ্তানি ও আমদানি কাঠামো নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে একের পর এক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

চীনের পথে যুক্তরাজ্য
প্রায় আট বছর পর চীন সফরে যাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিন দিনের এই সফরে তিনি বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং পরে যাবেন সাংহাইয়ে। যুক্তরাজ্যের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই কৌশল আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে লন্ডন এখন অনেক ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের চেয়ে বেইজিংয়ের কাছাকাছি অবস্থানে। যদিও নিরাপত্তা ও মানবাধিকার প্রশ্নে সতর্কতা রয়েছে, তবুও ব্যবসায়িক স্বার্থকে জাতীয় প্রয়োজন হিসেবে দেখছে ব্রিটিশ সরকার।

কানাডা-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা
উত্তর আমেরিকায় একই ধরনের ভাবনা থেকে ভারতমুখী হচ্ছে কানাডা। মার্চের প্রথম সপ্তাহে ভারতের বাজেট উপস্থাপনের পর দেশটি সফরে আসতে পারেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে নতুন করে বাণিজ্য সম্প্রসারণই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কানাডাকে ‘একান্নতম অঙ্গরাজ্য’ বলার ইঙ্গিত এবং উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি অটোয়াকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রপ্তানি দ্বিগুণ করাই এখন তাদের কৌশল। সেই লক্ষ্যেই ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হচ্ছে। আসন্ন সফরে ইউরেনিয়াম, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
![]()
ব্রাজিলের সক্রিয় উপস্থিতি
দক্ষিণ আমেরিকা থেকেও ভারতের দিকে নজর বাড়ছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা বড় প্রতিনিধি দল নিয়ে ভারতে আসছেন। ভারতীয় শিল্পনেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের জন্য বড় মিলনায়তন ভাড়া নেওয়াই এই সফরের গুরুত্ব বোঝায়।
ইতিহাস গড়া ভারত-ইউরোপ চুক্তি
এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। জানুয়ারির শেষ দিকে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান আখ্যা দিয়েছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমঝোতা হিসেবে। প্রায় দুইশ কোটি মানুষের বাজারকে যুক্ত করা এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের মোট উৎপাদনের বড় অংশ এক ছাতার নিচে এলো।
এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় পণ্যে শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং ভারতীয় পণ্যের জন্যও ইউরোপের বাজার আরও উন্মুক্ত হবে। গাড়ি, পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতের বাজারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই চুক্তিকে বিশ্বের দুটি বড় অর্থনীতির অংশীদারত্বের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ও ভারতের অবস্থান
এই নতুন জোট গঠনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নজর এড়ায়নি। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে ওয়াশিংটন, একই সঙ্গে কানাডার ক্ষেত্রেও চীনা পণ্যের প্রবেশপথ হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করছে তারা। তবে এসব চাপের মধ্যেও ভারত নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা জোর দিয়ে বলছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, কোনো দেশই অন্য দেশের সম্পর্কের ওপর ভেটো দিতে পারে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















