এক বছরের টালমাটাল অভিজ্ঞতার পর ব্রিটেন বুঝে গেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বদলানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বরং প্রশ্নটা এখন অন্য জায়গায়—ট্রাম্প কি বদলে দিয়েছেন ব্রিটেনকেই। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই এক বছর ব্রিটিশ রাজনীতিতে গভীর ছাপ ফেলেছে, যেখানে বিতর্কের ভাষা, সীমা এবং সাহস—সবই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।
ট্রাম্প-স্টারমার সম্পর্কের টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুরু থেকেই নরম কূটনীতির পথে হেঁটেছেন। কিন্তু সেই সৌজন্য কৌশল ব্রিটেনকে শুল্ক হুমকি কিংবা সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা থেকে বাঁচাতে পারেনি। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করায় ব্রিটিশ সরকারের ওপর ক্ষোভ ঝরেছে প্রকাশ্যেই।
স্টারমার শিবিরের দাবি, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প পিছু হটায় তার কৌশলের সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে। তবে একই সময়ে ট্রাম্প স্টারমারের করা আরেকটি চুক্তিকে আক্রমণ করেন, যেটি আগে তিনি নিজেই সমর্থন করেছিলেন। ভারত মহাসাগরের কৌশলগত চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প আখ্যা দেন চরম বোকামি হিসেবে। এতে ব্রিটিশ বিরোধীদের হাতে শক্ত অস্ত্র চলে আসে।
বিরোধী রাজনীতি ও ট্রাম্পের ভাষা
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক একই সুরে স্টারমারকে আক্রমণ করেন। তার অভিযোগ, কোনো কারণ ছাড়াই সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ডিয়েগো গার্সিয়ার বিমানঘাঁটি যৌথভাবে পরিচালনা করে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এই দ্বীপপুঞ্জ ফেরত দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছিল কনজারভেটিভ সরকারের আমলেই, সেই বাস্তবতা চাপা পড়ে যায় ট্রাম্পের বক্তব্যে।
এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, কীভাবে ট্রাম্প ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিতর্কের নিয়ন্ত্রণ নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনীতি কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার—প্রায় সব ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য মতের পরিসর সরে যাচ্ছে তার দিকে।
রাজনীতির কেন্দ্র সরে যাওয়া
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশ্লেষক টিম বেল বলেন, ব্রিটিশ রাজনীতির ভারকেন্দ্র স্পষ্টভাবেই বদলে গেছে। কেবল উগ্র ডানপন্থী নয়, মূলধারার দলগুলোও এখন এমন ভাষা ও নীতি প্রস্তাব করছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা এর জন্য খুব একটা মূল্যও দিচ্ছে না। ফলে বিতর্ক ক্রমেই আরও রুক্ষ ও মেরুকৃত হয়ে উঠছে।
এমনকি মধ্য-বামপন্থী ও সংযত হিসেবে পরিচিত স্টারমারও ট্রাম্পীয় ভাষার ছোঁয়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেননি। অভিবাসন প্রসঙ্গে তিনি একবার সতর্ক করেছিলেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ না করলে ব্রিটেন অচেনা মানুষের দ্বীপে পরিণত হতে পারে। পরে অবশ্য এই বক্তব্যের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করতে হয় তাকে।
অভিবাসন ও সামাজিক নীতিতে কঠোরতা
ডানপন্থী অভিবাসন বিরোধী দল রিফর্ম ইউকের চাপের মুখে লেবার সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের আটক, আঙুলের ছাপ নেওয়া ও জিজ্ঞাসাবাদের ছবি প্রচার করা হয়েছে। সরকার দাবি করছে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে দেশ থেকে সরানো হয়েছে।
এছাড়া বৈচিত্র্য ও সমতার নীতির বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়া বেড়েছে। লেবার পার্টির ভেতরের সাংস্কৃতিকভাবে রক্ষণশীল একটি অংশ এসব নীতির বিরুদ্ধে আইন করার আহ্বান জানাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, অনেক ব্রিটিশ কোম্পানি ও তথাকথিত অতিরিক্ত উদার নীতির চাপ থেকে সরে আসছে।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও গভীর রাষ্ট্র বিতর্ক
স্টারমারের এক সাবেক উপদেষ্টা সম্প্রতি নির্বাচিত নয় এমন আমলাদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে গভীর রাষ্ট্রবিরোধী ট্রাম্পের সুর স্পষ্ট, যা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সব পরিবর্তন অবশ্য কেবল ট্রাম্পের কারণে নয়। আর্থিক চাপের কারণে বিদেশি সহায়তা কমানো হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা ভেবে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা শিথিল করার চাপও আছে। তবু এসব সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে মিল খুঁজে পায়।
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে সীমারেখা
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ইস্যুতে ট্রাম্পের সমালোচনার জবাবে স্টারমার সংসদে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এটি দ্বীপ নিয়ে নয়, বরং গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টায় ব্রিটেনকে চাপে রাখার কৌশল। এই বক্তব্যে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে তিনি পিছপা হননি।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি নিয়ে আলোচনা শেষে ট্রাম্প সরে দাঁড়ালেও, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চাগোস চুক্তি নিয়ে বিতর্ক পিছিয়ে দিতে বাধ্য করে বিরোধীরা। তবু কূটনীতিকদের মতে, স্টারমারের নরম কৌশল শুল্কের ক্ষতি কমিয়েছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত রেখেছে।

শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্য সংঘাত
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় সেনাদের ভূমিকা খাটো করে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেন, তাতে স্টারমার প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান। তার ভাষায়, এটি অপমানজনক ও নিন্দনীয়, বিশেষ করে দুই দশকের যুদ্ধে প্রাণ হারানো ব্রিটিশ সেনাদের জন্য।
এই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, কিছু নীতিগত প্রশ্নে ব্রিটেন আর নীরব থাকতে রাজি নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















