নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, তাড়াহুড়ো করে এই কার্যক্রম চালানো হলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বিশেষ করে যখন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন আর কয়েক মাস দূরে।
তাড়াহুড়োর কারণে গণতন্ত্রের ঝুঁকি
বোস্টন থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৯২ বছর বয়সী অমর্ত্য সেন বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধন গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অবশ্যই পর্যাপ্ত সময় ও সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া জরুরি। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই দুই শর্তই অনুপস্থিত। তিনি বলেন, খুব কম সময়ের মধ্যে নাগরিকদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে, যা ভোটাধিকার প্রমাণের ন্যায্য সুযোগ নষ্ট করছে।
ভোটারদের প্রতি অবিচার
অমর্ত্য সেনের ভাষায়, এই প্রক্রিয়া ভোটারদের প্রতি অন্যায় এবং ভারতের গণতন্ত্রের প্রতিও অসঙ্গত। তাঁর মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যা মানুষকে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় ফেলে।
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে অভিযোগ
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, সময়ের চাপ শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যেও স্পষ্ট। শান্তিনিকেতনে নিজের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁর নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য আগে থেকেই সরকারি নথিতে থাকা সত্ত্বেও তাঁকে মৃত মায়ের বয়স সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
নথির জটিলতা ও গ্রামীণ বাস্তবতা
অমর্ত্য সেন বলেন, গ্রামীণ ভারতে জন্ম নেওয়া বহু নাগরিকের মতো তাঁরও জন্মসনদ নেই। ফলে ভোটাধিকার প্রমাণ করতে অতিরিক্ত কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়েছে। যদিও তাঁর ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে, তবে যাঁদের সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ভুল ব্যবস্থার ওপর জোর না দেওয়ার আহ্বান
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত নয় ত্রুটিপূর্ণ কোনো ব্যবস্থার ওপর অনড় থাকা এবং তার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় ভুলের দিকে ঠেলে দেওয়া। কে লাভবান হচ্ছে, তা নয়—গণতন্ত্রের স্বার্থই এখানে মুখ্য হওয়া উচিত।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা
বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত শ্রেণির মানুষ। অমর্ত্য সেনের মতে, নতুন ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে যেসব নথি চাওয়া হচ্ছে, সেগুলো জোগাড় করা গরিব মানুষের জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এই নথিনির্ভরতা শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ
ভোটাধিকার প্রয়োগের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ জানান অমর্ত্য সেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক সময় তাঁদের অধিকার, এমনকি ভোটাধিকারও প্রতিষ্ঠা করতে সমস্যায় পড়েন। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী তৎপরতার কারণে ভারতীয় মুসলমানরা বিশেষভাবে পিছিয়ে পড়ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ও বৈষম্য ও লক্ষ্যবস্তুর শিকার হতে পারেন বলে তিনি সতর্ক করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















