মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি পরিণত হয়েছে অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার বড় সংকটে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে বছরে একশ পঞ্চান্ন মিলিয়ন টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পঁচিশ বছরের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
বর্জ্যের চাপ বাড়ছে দ্রুত
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে অঞ্চলটিতে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদন বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশি। প্রতিদিন একজন মানুষের কাছ থেকে প্রায় শূন্য দশমিক নয় কেজি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যেখানে বিশ্ব গড় শূন্য দশমিক সাত নয় কেজি। এই অতিরিক্ত বর্জ্যের বড় অংশই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আসছে না।

পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি
অব্যবস্থাপিত বর্জ্যের কারণে প্রতিবছর পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাত দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ। বায়ু, মাটি ও পানিদূষণের পাশাপাশি সামুদ্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভূমধ্যসাগর ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত সাগরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, যার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যের।
খাদ্য অপচয়ে ভয়াবহ চিত্র
খাদ্য বর্জ্য এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বছরে খাদ্য অপচয়ের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ষাট বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ, অথচ এই অঞ্চলেই প্রতি ছয়জনের একজন তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অপচয়ের এই চিত্র সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংগ্রহ হলেও পুনর্ব্যবহার পিছিয়ে
যদিও অঞ্চলটিতে বর্জ্য সংগ্রহের হার তুলনামূলকভাবে ভালো, তবু পুনর্ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় ঘাটতি রয়েছে। মোট বর্জ্যের দশ শতাংশেরও কম পুনর্ব্যবহার বা পুনঃব্যবহার হয়। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলা, পোড়ানো বা কোনো হিসাব ছাড়া ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সম্ভাবনার দিক ও দেখাচ্ছে প্রতিবেদন
প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে সংগৃহীত বর্জ্যের প্রায় তিরাশি শতাংশ পুনঃব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রক্রিয়া কিংবা জ্বালানি উৎপাদনে কাজে লাগানো সম্ভব। বৃত্তাকার অর্থনীতির পথে এগোতে পারলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতেই সৃষ্টি হতে পারে আরও ভালো কর্মসংস্থান, বিশেষ করে পুনর্ব্যবহার ও পরিষেবা খাতে।
বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
টেকসই নগর ও জনপদ গড়ে তুলতে এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে বছরে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। বর্তমানে যেখানে ব্যয় প্রায় সাত দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ, সেখানে প্রয়োজন দাঁড়াবে এগারো দশমিক ছয় বিলিয়ন। ভবিষ্যতে আধুনিক ও সর্বজনীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

একক সমাধান নেই, দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে বলছে, এই সংকটের কোনো একক সমাধান নেই। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর জন্য ভিন্ন কৌশল, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য ভিন্ন পথ এবং সংঘাতপীড়িত রাষ্ট্রগুলোর জন্য কম খরচের স্থানীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। পুরো সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া বর্জ্য সংকটকে টেকসই প্রবৃদ্ধির সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















