বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তবে রাশিয়া কোনোভাবেই বৈশ্বিক সংঘাতে যেতে চায় না—এমন মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। সোমবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশ উদ্বেগজনক হলেও রাশিয়া ‘পাগল’ নয় যে বিশ্বযুদ্ধের পথে হাঁটবে।
বিপজ্জনক বিশ্ব পরিস্থিতি ও রাশিয়ার অবস্থান
মেদভেদেভ বলেন, বিশ্ব এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন সংঘাতের কারণে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। তার ভাষায়, মানুষের সহনশীলতার সীমা কমে আসছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, রাশিয়া বৈশ্বিক সংঘাত চায় না, যদিও এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে টানাপোড়েন
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক চরম উত্তেজনায় পৌঁছেছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর এটিই পশ্চিম ও রাশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাত বলে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতরা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তবুও পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়।
মেদভেদেভ দাবি করেন, পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার স্বার্থ উপেক্ষা করে আসছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনে যাকে রাশিয়া ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে উল্লেখ করে, তা প্রমাণ করে যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় মস্কো কঠোর অবস্থান নিতেও পিছপা হবে না।
ট্রাম্পের প্রশংসা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ

সাক্ষাৎকারে মেদভেদেভ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ শুরু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তার মতে, এ ধরনের সংলাপ আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
নাটোর হুমকি ও ইউক্রেনের দৃষ্টিভঙ্গি
ইউক্রেন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা এই যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে দেখছে এবং একে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী ভূমি দখলের চেষ্টা বলে আখ্যা দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেনে রাশিয়া সফল হলে ভবিষ্যতে ন্যাটোর দেশগুলোকেও আক্রমণ করতে পারে। তবে মস্কো এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছে।
২০১৪ সালের পটভূমি
২০১৪ সালে ইউক্রেনে ময়দান বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়াপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই পূর্ব ইউক্রেনে সংঘাতের সূচনা হয়। ওই সময় রাশিয়া ক্রিমিয়া অধিভুক্ত করে এবং পূর্ব ইউক্রেনে মস্কো সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে কিয়েভের বাহিনীর লড়াই শুরু হয়।

ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে যে উত্তেজনা দেখা গেছে, তা নিয়ে মেদভেদেভ বলেন, একসঙ্গে এত ঘটনা বিশ্ব পরিস্থিতিকে ‘অতিরিক্ত চাপের’ মধ্যে ফেলেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট যদি বিদেশি শক্তির দ্বারা অপসারিত হতেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে যুদ্ধের শামিল হিসেবে দেখত।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পশ্চিমা অভিযোগ প্রসঙ্গে মেদভেদেভ বলেন, সেখানে রাশিয়া বা চীনের হুমকির কথা বলা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ‘ভয় দেখানোর গল্প’। তার দাবি, পশ্চিমা নেতারা নিজেদের পদক্ষেপকে বৈধতা দিতেই এমন দাবি তুলে ধরছেন।

মেদভেদেভের ভূমিকা ও কঠোর বার্তা
যদিও রাশিয়ার চূড়ান্ত নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই শেষ কথা বলেন, তবুও মেদভেদেভকে রাশিয়ার কঠোরপন্থী শিবিরের ভাবনার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য দিয়ে যুদ্ধ আরও বাড়লে পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেছেন।
মেদভেদেভের মতে, রাশিয়া সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে নিজেদের স্বার্থে প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নিতেও দ্বিধা করবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















